নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:২১ পিএম
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটির কারখানাগুলোতে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক অস্থিরতা পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা ও তাদের সার্বিক জীবনমান নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে নতুন গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডকে দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সরকারের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, প্রশাসন দেশে স্থায়ী শান্তি, শৃঙ্খলা, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চায়। তৈরি পোশাকশিল্পের অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের গোড়াপত্তন ও বিকাশে দূরদর্শী ভূমিকা রেখেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সরকার চায় সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই শিল্প আরও বহুদূর এগিয়ে যাক এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভিত শক্তিশালী করুক।
মজুরি কাঠামোর আইনি দিক ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বোর্ড গঠনের আইনি সময়সীমা বহাল থাকলেও সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে আগেই আলোচনা শুরু করে।
মালিকপক্ষ দ্রুত তাদের প্রতিনিধির নাম চূড়ান্ত করলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাম প্রস্তাব করতে কিছুটা দেরি হয়।
শনিবার রাতে শ্রমিকপক্ষের মনোনীত প্রতিনিধির নাম হাতে পাওয়ার পর রোববার সকালেই মজুরি বোর্ড গঠন সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিক সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেন যে গঠিত মজুরি বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা খোলামেলা আলোচনার সুযোগ পাবেন। বর্তমান উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মানজনক জীবনধারণ এবং আর্থিক সক্ষমতার দিকগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সেখানে একটি গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংকট নিরসনে যখন নিয়মতান্ত্রিক আলোচনার পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল, তখন সহিংস আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
আন্দোলনের নামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিবাদ ও দাবির আড়ালে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন এলাকায় হামলা, গণপরিবহন ও যানবাহন ভাঙচুর এবং তৈরি পোশাক কারখানায় সরাসরি আগুন দেওয়ার মতো চরম অরাজক ঘটনা ঘটেছে।
এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতায় লিপ্ত হবে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবে কিংবা কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাবে, তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
আন্দোলনের পেছনে বহিরাগত উসকানি ও অনুপ্রবেশকারীদের অপতৎপরতার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে গভীর ষড়যন্ত্রের ইন্ধন জোগানো হচ্ছে। এর মূল চক্রান্ত হলো দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন লাইন ধ্বংস করা এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করা।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, সরকার এই অপতৎপরতা রুখে দিতে বদ্ধপরিকর। যারা সহিংসতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত, তাদের একে একে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
শ্রমিক অসন্তোষের মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া শত শত কারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পোশাকশিল্পের মালিকদের দ্রুততম সময়ে উৎপাদন কার্যক্রম সচল করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো বিশেষ কারণে কারখানা সাময়িক বন্ধ থাকলে তা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়িত্বশীল আলোচনার মাধ্যমেই উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে।
বৈদেশিক রপ্তানির জন্য চুক্তিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন যাতে কোনো অবস্থাতেই থমকে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার তাগিদ দেন তিনি।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন