নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:১২ পিএম
দৈনন্দিন জীবনে অজু করার পর অনেকেরই বিড়ি বা সিগারেট পানের অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মুসুল্লিদের মনে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয় যে ধূমপানের ফলে পবিত্রতার প্রতীক অজু নষ্ট হয়ে যায় কি না, অথবা ওই অবস্থায় সরাসরি নামাজে দাঁড়ানো বৈধ কি না।
ইসলামি শরিয়তের প্রামাণিক ফিকাহ শাস্ত্রের আলোকে এ বিষয়ে রয়েছে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী অজু ভঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কারণ নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণত মানবদেহের ভেতর থেকে কোনো নাপাক বা অপবিত্র বস্তু নির্গত হওয়া কিংবা নির্গত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমেই মূলত অজু ভেঙে যায়।
ফিকাহ শাস্ত্রের অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া-ই আলমগিরির বিবরণ অনুযায়ী অজু ভঙ্গের প্রধান সাতটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মল ও মূত্রের রাস্তা দিয়ে অপবিত্র কোনো কিছু যেমন ময়লা, পানি, রক্ত বা বাতাস বের হওয়া।
দ্বিতীয়ত, মুখের লালার সঙ্গে সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি রক্ত নির্গত হওয়া। রক্তের পরিমাণ লালার চেয়ে কম হলে অজু নষ্ট হয় না।
তৃতীয়ত, চিত হয়ে, কাত হয়ে বা কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে এমনভাবে গভীর ঘুমে নিমগ্ন হওয়া যাতে শরীরের ভারসাম্য শিথিল হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, অপ্রকৃতিস্থ বা মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়া।
পঞ্চমত, মাদকাসক্ত বা নেশাগ্রস্ত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারানো।
ষষ্ঠত, কোনো কারণে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া।
সপ্তমত, সাধারণ নামাজে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় উচ্চস্বরে হেসে ওঠা। তবে জানাজার নামাজে হাসলে অজু ভাঙে না।
যেহেতু বিড়ি বা সিগারেট সেবনের মাধ্যমে মানবদেহের ভেতর থেকে কোনো অপবিত্র তরল বা বস্তু বাইরে নির্গত হয় না, তাই নিছক ধূমপান করার কারণে অজু সরাসরি নষ্ট হয় না। রদ্দুল মুহতারের প্রথম খণ্ডের ১৪৪ পৃষ্ঠা এবং ফাতাওয়া-ই আলমগিরির প্রথম খণ্ডের ১২ পৃষ্ঠায় এই ফতোয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ধূমপানে অজু অটুট থাকলেও ইসলামে এই অভ্যাসকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ও বারণ করা হয়েছে।
এর পেছনে প্রধান দুটি ধর্মীয় ও নৈতিক কারণ হলো চরম আর্থিক অপচয় এবং মানবদেহের মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি। নিজের স্বাস্থ্য ও অর্থসম্পদকে জেনেবুঝে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া ইসলামি শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
পবিত্র কুরআনের সুরা আল-বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।
এর পাশাপাশি ধূমপানের তীব্র দুর্গন্ধ নিয়ে নামাজে দাঁড়ানো ও মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামি নির্দেশনায় বিশেষ সতর্কতা এসেছে। বিড়ি ও সিগারেটের উৎকট গন্ধ আশপাশের সাধারণ মানুষ ও সহযাত্রীদের জন্য চরম কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে অন্যকে যেকোনোভাবে কষ্ট দেওয়া কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে।
সহিহ বুখারির এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে ঘোষণা করেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশী বা আশপাশের কোনো মানুষকে কষ্ট না দেয়।
নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে ফিকহবিদদের অভিমত হলো, বিড়ি বা সিগারেটের দুর্গন্ধ মুখে নিয়ে নামাজ আদায় করলে ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে, কারণ এই কাজের ফলে অজু ভেঙে যায় না। তবে মুখে তীব্র গন্ধ নিয়ে আল্লাহর সামনে ইবাদতে দাঁড়িয়ে যাওয়া চরম আদববহির্ভূত এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে তা মারাত্মক অনুচিত।
একইভাবে কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুনের তীব্র গন্ধ মুখে নিয়ে জামাতে বা মসজিদে প্রবেশে হাদিসে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কারণ এতে উপস্থিত মানুষ এবং আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা চরম কষ্ট পান। বিড়ি ও সিগারেটের তামাকজাত দুর্গন্ধ কাঁচা পেঁয়াজ-রসুনের চেয়েও বহুগুণ ঝাঁঝালো ও কষ্টদায়ক। ফলে দুর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যারা ধূমপানের বদভ্যাসে আক্রান্ত, তারা একবারে এই অভ্যাস ত্যাগ করতে না পারলেও এই অজুহাতে নামাজ ও জামাত থেকে দূরে থাকা যাবে না। তবে মসজিদে যাওয়ার আগে কিংবা নামাজে দাঁড়ানোর পূর্বে মিসওয়াক, টুথব্রাশ বা ভালো মানের মাউথওয়াশ ব্যবহার করে মুখের দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করা আবশ্যক।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন