সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের স্বনির্ভর উন্নয়ন ও দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের সেই ভাষণে তিনি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান। জনসংখ্যার তীব্র চাপ, ব্যাপক বেকারত্ব, বিপুল ভূমিহীন জনগোষ্ঠী এবং নিম্ন মাথাপিছু আয়সহ নানা কঠিন উন্নয়ন সংকট মোকাবেলার বাস্তবতা সেদিন বিশ্বদরবারে তুলে ধরা হয়।
ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বাংলাদেশে বসবাস করে। দেশটির জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সেই সময় বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বেকার অথবা ভূমিহীন কৃষক ছিলেন, যাদের একটি বড় অংশ কেবল মৌসুমি কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর করতেন। একই সঙ্গে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল।
প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, এত সংকটের পরও বাংলাদেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি এবং কখনো হবেও না। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন এই রাষ্ট্রপ্রধান। ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং নতুন বিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই সাথে কোনো নাগরিক যেন অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
কৃষি ও গ্রামীণ রূপান্তরকে মূল অগ্রাধিকার উল্লেখ করে দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে সরাসরি জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্বনির্ভরতাকে জাতীয় মূলমন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেছিলেন, জাতিকে অবশ্যই সফল হতে হবে, কারণ ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ভাষণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক মেলবন্ধন। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংযোগ তুলে ধরে তিনি ভিনদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানান। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, অঞ্চলের কাছে কিংবা দূরে যেকোনো বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে অবনতিশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাবের কথাও বিশ্বমঞ্চে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। বিশ্বের অপরাপর অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ায় তখন পর্যন্ত কার্যকর উদ্যোগের অভাবের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। পারস্পরিক কল্যাণের লক্ষ্যে অভিন্ন সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর একত্রিত হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময় বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি জানান, আঞ্চলিক কাঠামো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমায় এবং অভিন্ন স্বার্থে মতভেদ দূর করতে সাহায্য করে।
উন্নত উত্তর ও উন্নয়নশীল দক্ষিণের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জিয়াউর রহমান। বিশ্বের একটি বিশাল অংশ দারিদ্র্যের কবলে থাকলে বৈশ্বিক শান্তি টেকসই হতে পারে না বলে মত দেন তিনি। বিশ্বকে ধনী ও দরিদ্রের বিভাজনে খণ্ডিত রাখা হলে আন্তর্জাতিক শান্তি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন। ব্রান্ডট কমিশনের সুপারিশ সমর্থন করে তিনি উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ন্যায্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধার ওপর জোর দেন।
উন্নত বিশ্বকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণ করতে এবং তা শর্তহীন অনুদান হিসেবে বরাদ্দের আহ্বান জানানো হয়। জ্বালানি সংকট নিরসনে স্বল্পমূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সম্পদ বিকাশে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তিনি। তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে সৃষ্ট চাপের কথা জানিয়ে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এই রাষ্ট্রপ্রধান। ভাষণের সমাপ্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করে তিনি উল্লেখ করেন, মানবজাতির জীবনমান উন্নয়নের পর্যাপ্ত সম্পদ ও প্রযুক্তি পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে।
আসন্ন ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্ব সংস্থার সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখবেন তিনি। এর আগে ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, বৈশ্বিক শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা সংকটসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন