সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১০:২৭ এএম
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে অনির্দিষ্টকাল এই সংকটের পুরো বোঝা কেবল বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বুধবার সকালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল এবং দীর্ঘ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।
শিবিরগুলোতে খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রায় ছয় হাজার শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণও চলছে যাতে ভবিষ্যতে নিজ রাজ্যে ফিরে তারা পুনঃএকীভূত হতে পারে। তবে শিবিরগুলো দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য কোনো আদর্শ জায়গা নয়। সহমর্মিতা দেখানোর পর্ব শেষ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন এখন সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের পথে হাঁটার সময় এসেছে। বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ব্যবস্থাপনার বদলে এই সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।
প্রথম প্রস্তাবে তিনি বলেন দ্রুত নিরাপদ স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারের ভেতরে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের সর্বোচ্চ প্রভাব খাটাতে হবে। দ্বিতীয় দফায় রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানানো হয়। নিজভূমিতে তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তারা ফিরে যাওয়ার ভরসা পাবে না। তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের উদার আতিথেয়তার কারণে তাদের নিজস্ব উন্নয়নের সুযোগ যেন নষ্ট না হয় সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
চতুর্থত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহির উদ্যোগে গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত সংস্থাকে সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়। পঞ্চম প্রস্তাবে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। মাদকভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি মানবপাচার ডিজিটাল অপরাধ ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে উঠছে।
দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতির পেছনে ব্যয় প্রতিদিনই বাড়ছে। সামাজিক অর্থনৈতিক পরিবেশগত এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অস্বাভাবিক চাপের মুখে। অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে রোহিঙ্গারা মানবপাচার ও মাদকের মতো জটিল অপরাধে জড়াচ্ছে এমনকি অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ভেসে যাচ্ছে। পরিস্থিতি জটিল হলেও মানবিক সহায়তার তহবিল নাটকীয়ভাবে কমে আসছে। গত ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় যেখানে ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছিল ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে যা কেবল জীবনরক্ষার ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে পারে।
মানবিক সহায়তার অর্থ কমিয়ে সংকটকে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানানো গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে এই সংকটের সূচনা হয়েছে মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানেই করতে হবে। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। রোহিঙ্গাদের এখনো বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পাশাপাশি চলছে বেআইনি আটক ও জোরপূর্বক শ্রম। ফলে সেখানে প্রত্যাবাসনের মতো নিরাপদ পরিবেশ এখনো তৈরি করা যায়নি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন ১৯৭৮ সাল এবং আশির দশকে যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিল তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার আলোচনার মাধ্যমে সফল প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের সহিংসতার পর এই সংকট আরও গভীর রূপ ধারণ করে। প্রতি বছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে ফলে সংকটের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে নতুন একটি প্রজন্ম। তরুণেরা অনিশ্চয়তার ভেতর বড় হচ্ছে আর বৃদ্ধরা ভিটেমাটির স্মৃতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করলে বাংলাদেশ তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে সব ধরনের সহায়তা দেবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন