সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক এই আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে হলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে অবাধ প্রবেশাধিকার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশের দায় সামান্য হলেও ঝুঁকির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম। অথচ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি। এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাবে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা বিপন্ন হবে এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক সংকটে পড়বে।
বর্তমানে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক শতাংশের সমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জলবায়ু অভিযোজন খাতে প্রায় তিন দশমিক এক নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ছাড়া এই বিপুল ক্ষতির ঝুঁকি এককভাবে এড়ানো অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে নেওয়া একাধিক বৃহৎ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সাথে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ সংরক্ষণ, বন্যার তীব্রতা হ্রাস, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ চলছে। এছাড়া গঙ্গা ও তিস্তা নদীর অববাহিকা ঘিরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা চালু, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং টেকসই বৃত্তাকার অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে সবুজ শিল্পায়নে জোর দিচ্ছে সরকার। একই প্রক্রিয়ায় একটি কার্যকর জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজও চলমান রয়েছে।
উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতার নীতি অনুসরণের তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈশ্বিক সংকট সমাধানে তিনি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব করেন। প্রথমত, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এক দশমিক পাঁচ ডিগ্রিতে ধরে রাখতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর জন্য অভিযোজন তহবিলের নিয়মিত ও সহজলভ্য জোগান নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সমতাভিত্তিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে জলবায়ু-বান্ধব আধুনিক প্রযুক্তিতে সবার প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, সহজ অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। পঞ্চমত, জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল দ্রুত কার্যকর করে সেখানে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।
বাংলাদেশ তার জলবায়ু কৌশল বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন এবং আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তুলে ধরবেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন