বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

ধেয়ে আসছে এল নিনো বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া ও মহাপ্রলয়ের কড়া শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

ধেয়ে আসছে এল নিনো বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া ও মহাপ্রলয়ের কড়া শঙ্কা

ধেয়ে আসছে এল নিনো এবং বিশ্বজুড়ে এই প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু ও সামগ্রিক আবহাওয়ার ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে জোরালো সতর্কবার্তা জারি করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা চলতি অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় নজিরবিহীন রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

সমুদ্রের উত্তাপ বৃদ্ধির এই প্রভাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে আবহাওয়ার স্বাভাবিক রূপরেখা ভেঙে পড়ে চরম তাপমাত্রা, আকস্মিক খরা ও অতিবৃষ্টির মতো বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ডব্লিউএমও উল্লেখ করেছে, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর আগে এই এল নিনো আরও বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে।

পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ১৯৫০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর একটি হতে চলেছে। মূলত মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াকে আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় এল নিনো বলা হয়।

এই প্রক্রিয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন, মেঘমালার গতিপথ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক বিন্যাস ওলটপালট হয়ে যায়।

ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শুরুর পর এটিই হতে পারে উষ্ণতার সর্বোচ্চ নতুন রেকর্ড।

জাতিসংঘের এই আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ুতে এল নিনো ইতিমধ্যে শক্ত ভিত্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং খুব দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই চরম আবহাওয়াগত পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর জলবায়ুতে এল নিনোর আবির্ভাব ঘটে থাকে।

একবার সক্রিয় হলে এই পরিস্থিতি সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে স্থায়ী হয়। এর ঠিক বিপরীত আবহাওয়াগত পর্যায়কে বলা হয় লা নিনা।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, এই জলবায়ুগত উলটপালটের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাপপ্রবাহ অনুভূত হবে।

বৃষ্টিপাতের ধরনে চরম রূপান্তর দেখা দেওয়ায় কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেবে, আবার অনেক অঞ্চলে প্রবল অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যাবে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন, কৃষিখাত, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং নদী-তীরবর্তী মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন যে এল নিনো নিজে বায়ুমণ্ডলে নতুন কোনো তাপ তৈরি করে না। বরং এটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগরে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত থাকা বিপুল তাপকে খুব দ্রুত বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে চরম গতিশীল করে তোলে।

বর্তমানে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে উষ্ণ অবস্থায় থাকায় এবার বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি।

এর সাথে মানবসৃষ্ট কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও কার্বন নির্গমন পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাকে আগেই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিদ্যমান সেই উষ্ণায়নের সাথে এবার সুপার এল নিনোর উত্তাপ যুক্ত হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত চরম তাপমাত্রা ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়বে বলে আবহাওয়াবিদেরা নিশ্চিত করেছেন।