বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
পাটের মৌসুম ও সংগ্রাম

পাট চাষে উৎপাদন কমলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কা

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম

পাট চাষে উৎপাদন কমলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কা

মাঠের পর মাঠ বিস্তৃত সবুজ পাট কেটে সোনালী আঁশ ঘরে তোলার মৌসুম চলছে। তবে তীব্র পরিশ্রম ও বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে দিনরাত খেটেও চলতি মৌসুমে ফলন ও কাঙ্ক্ষিত দাম নিয়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকেরা।

একসময় পাট বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছিল সোনালী আঁশের দেশ হিসেবে। বাংলাদেশে মূলত তোষা পাট ও সাদা পাট—এই দুই ধরনের পাট আবাদ করা হয়। এর মধ্যে তোষা পাটের আঁশ তুলনামূলকভাবে লম্বা, নরম ও মজবুত হওয়ায় দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা এবং বাজারদর বেশি থাকে। প্রতি বছর জুলাই থেকে আগস্ট মাসে জমি থেকে পাট কেটে জাগ দেওয়ার কাজ পুরোদমে শুরু হয়। বহরপুর আবাসন সংলগ্ন বিস্তীর্ণ নিচু বিলে শুকনা মৌসুমে লাগানো পাট এখন বর্ষার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই গভীর পানির মধ্যেই কাকডাকা ভোর থেকে কৃষকদের কাস্তে হাতে নামতে হচ্ছে। কাজের চাপে কৃষকদের দুপুরে ঘরে ফিরে খাওয়ার সময়টুকুও থাকে না। বাড়ি থেকে ছোট নৌকায় করে মাঠে খাবার পৌঁছে দেয় পরিবারের শিশুরা। নৌকার ওপর বসেই ডিম-ভাতের সাধারণ আহার শেষ করে তারা আবারও নেমে পড়েন কোমর কিংবা বুকসমান পানিতে। ফজরের নামাজের পর থেকে শুরু করে বিকাল পাঁচটার আজান পেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা এই পাট কাটার কাজ চলে। সাধারণ মানের জমিতে একজন শ্রমিক দিনে ছয় থেকে সাত শতাংশ জমির পাট কাটতে পারেন। যেখানে পাট খুব একটা ঘন বা ভালো হয়নি, সেখানে আট থেকে নয় শতাংশ পর্যন্ত কাটা সম্ভব হয়।

উঁচু ডাঙার জমিতে পাটের কিছু ভালো ফলন হলেও নিচু বা ডোবা এলাকায় ফলন একেবারেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। অনেক গাছ স্বাভাবিক উচ্চতার তুলনায় ছোট হয়ে গেছে। গত মৌসুমের তুলনায় এবার সামগ্রিক ফলন অনেকটাই কম। এর ওপর বাজারে সারের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান উৎপাদন খরচের বিপরীতে পাটের মণপ্রতি দর সাত থেকে আট হাজার টাকা হওয়া প্রয়োজন। অথচ স্থানীয় বাজারে বর্তমানে পাট বিক্রি হচ্ছে চার হাজার থেকে চার হাজার ২০০ টাকা দরে। গত বছর ভালো ফলনের মৌসুমেও কৃষকেরা একই রকম দরে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাট কাটার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ধাপ হলো আঁটি বেঁধে তা পানিতে জাগ দেওয়া। সব পাট একসঙ্গে জাগ দিলে তা নির্দিষ্ট সময়ে পচিয়ে আঁশ ছাড়ানো ও ধোয়া সম্ভব হয় না। বাড়তি সময় পানিতে থাকলে পাট পচে আঁশের মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কয়েক দিন পরপর ধাপে ধাপে পাট জাগ দেওয়া হয়। নদী, খাল বা বিলের গভীর পানিতে স্তরে স্তরে পাটের আঁটি সাজিয়ে তার ওপর কলাগাছের কাণ্ড, বাঁশ কিংবা কাদা মাটির ভার চাপিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয়।

পানির নিচে ১০ থেকে ২০ দিন রাখার পর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অণুজীব গাছের শক্ত ছাল ও বহিরাংশ নরম করে তোলে। এরপর পুনরায় কোমর পানিতে নেমে এক হাতে পাটের গোড়া ধরে অন্য হাতে টেনে বের করা হয় ঝকঝকে সোনালী আঁশ। এই ভেজা আঁশ নদীর পরিষ্কার পানিতে বারবার ধুয়ে নৌকায় করে ডাঙায় তোলা হয়।

আঁশ সংগ্রহের পর শুরু হয় শুকানোর পর্ব। গ্রামের রাস্তার দুই পাশ, বাড়ির আঙিনা, খোলা মাঠ এবং বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে সারি সারি আঁশ শুকানো হয়। একই সাথে জ্বালানি ও বেড়ার কাজে ব্যবহৃত মূল্যবান পাটকাঠিও আলাদাভাবে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয়। শুকানো শেষ হলে এসব পাট নসিমন, ভ্যান বা ঘোড়ার গাড়িতে বোঝাই করে স্থানীয় পাইকারি হাটে তোলা হয় বিক্রির উদ্দেশ্যে।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে শুধু চটের বস্তা নয়, বরং দুই শতাধিক রকমের বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, উৎপাদন উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকার প্রধান এই ফসল ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটছে না।