শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬,
রাজবাড়ী ভ্রমণ

পাট ও মাছের জনপদ: রাজবাড়ীর লক্ষণদিয়া বিলের কথকতা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

পাট ও মাছের জনপদ: রাজবাড়ীর লক্ষণদিয়া বিলের কথকতা

বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে সারি সারি পাটকাঠির স্তূপ যেন কোনো জলপাহাড়ে মগ্ন অসংখ্য নীরব প্রহরী। রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের লক্ষণদিয়া গ্রামের নামের সাথে মিল রেখেই এই এলাকার বিলের নামকরণ করা হয়েছে লক্ষণদিয়া বিল। পাট আর মাছের প্রাচুর্যের পাশাপাশি নানা লোকজ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এই জনপদ এখন গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণ।

বালিয়াকান্দি রাজবাড়ী জেলার অন্যতম প্রধান পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত। চলতি অর্থবছরে বালিয়াকান্দি উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জামালপুর ইউনিয়ন। একসময় পাটকাঠি কেবল বাসাবাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি একটি মূল্যবান রপ্তানি পণ্য। প্রসাধনী কার্বন, কাগজ, মেকআপ সামগ্রী, ওয়াটার ফিল্টার ও পটকার উপাদান তৈরিতে চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাটচাষের পাশাপাশি বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে লক্ষণদিয়া বিলে প্রচুর পরিমাণে সুস্বাদু দেশি মাছ পাওয়া যায়। আশপাশের কয়েকশ মৎস্যজীবী পরিবার এই বিলে মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। মুক্ত জলাশয় হওয়ায় এই বিল প্রাকৃতিকভাবে দেশি মাছের বংশবৃদ্ধি ও ডিম ছাড়ার নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রতিদিন সকালে মাশালিয়া বাজারের মাধবের বটতলা এলাকায় বসে মাছের জমজমাট হাট। লক্ষণদিয়া বিলের তাজা মাছ নিয়ে এখানে জড় হন স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা। পুটি, শিং, মাগুর, কই, টাকি, ট্যাংরা ও খলসের পাশাপাশি রুই, কাতল ও মৃগেলের মতো দেশীয় প্রজাতির রকমারি মাছের পসরা বসে এই হাটে। আকারের দিক থেকে ছোট হলেও মাধবের বটতলার এই সকালের হাট পুরো মাশালিয়া ও আশপাশের এলাকার দেশি মাছের চাহিদা মেটাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিক্রেতার প্রত্যাশিত দাম আর ক্রেতার সামর্থ্য অনুযায়ী দরদামে মুখরিত হয়ে ওঠে এই গ্রামীণ হাট।

কৃষি ও মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের পাশাপাশি লক্ষণদিয়া বিল স্থানীয় সংস্কৃতিরও এক বড় কেন্দ্র। বর্ষার শেষে এই বিলে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ হাজারো মানুষের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়। বাইচ শুরুর বহু আগে থেকেই গ্রামের পথঘাট ও জলপথ জুড়ে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। ফসলের মৌসুমে কৃষকের জীবিকা এবং মাছ ধরার মৌসুমে জেলেদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত এই জলরাশি নৌকা বাইচের মধ্য দিয়ে আনন্দ ও উৎসবের মঞ্চে রূপ নেয়। প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুঘল আমল থেকে শুরু হওয়া এই লোকজ সংস্কৃতি আজো টিকিয়ে রেখেছে স্থানীয় মানুষ। কান্ডারীর নির্দেশনায় ও মাঝিদের প্রাণপণ বৈঠার টানে উত্তাল হয়ে ওঠা লক্ষণদিয়া বিলের এই নৌকা বাইচ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো দর্শক। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই বর্ণিল উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।