শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

পাহাড়ে আনারস ও আম চাষে বোম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:০৪ এএম

পাহাড়ে আনারস ও আম চাষে বোম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ের চূড়া ও ঢালে প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরে বসবাস করছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বোম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। আষাঢ়ের বর্ষায় পাহাড় যখন সবুজ রূপ নেয়, তখন পাড়াগুলোতে শুরু হয় কৃষিকাজের কর্মব্যস্ততা। জুম আর পাহাড়ি ঢালজুড়ে আবাদ করা আম, আনারস ও মৌসুমি ফলের পরিচর্যা এবং সংগ্রহের ওপরই নির্ভর করে তাদের পরিবারগুলোর জীবন ও জীবিকা।

ভোরে পাহাড়ের ঘুম ভাঙতেই ঝুড়ি হাতে বাগানমুখী হন নারী-পুরুষেরা। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া পিচ্ছিল ও কাদাময় দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জুমের ভেতর থেকে ফল সংগ্রহ করতে হয়। সংগৃহীত পাহাড়ি আম ঝুড়িতে বোঝাই করে মাথায় তুলে উঁচু-নিচু টিলা পেরিয়ে সমতলে নিয়ে আসা হয়। একটি ঝুড়িতে সর্বোচ্চ ৪০ কেজি পর্যন্ত আম বহন করা যায়। বর্ষার দিনে কাদা ও খাড়া চড়াই ভেঙে এই ভারি বোঝা বহন করতে প্রচণ্ড শারীরিক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয় চাষিদের। অতিরিক্ত শ্রম সত্ত্বেও বাজারে আমের সন্তোষজনক দাম মিলছে না বলে জানান স্থানীয়রা।

ক্যালেন্ডার জাতের মিষ্টি আনারস এই জনপদের কৃষির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রায় ৩০ বছর ধরে স্থানীয় পাহাড়িরা এই জাতের আনারসের চাষাবাদ করছেন। প্রথমে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে জমি প্রস্তুত করা হয়। এরপর পাহাড়ি ধানের সাথে নিচে নিচে এই জাতের আনারসের চারা রোপণ করা হয়। কয়েক বছর আনারস উৎপাদনের পর একই জমিতে রোপণ করা হয় আমগাছ। এখন পাহাড়ের চূড়াগুলোতে একই জমিতে ওপরে আমের বাগান এবং নিচে মাটির কাছাকাছি আনারসের আবাদ দেখা যায়।

পাহাড়ের পিচ্ছিল মেঠোপথ দিয়ে ফসল নিচে নামানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আনারস বহনের জন্য পাহাড়ি চাষিরা বিশেষ ধরনের বাঁশের ঝুড়ি ব্যবহার করেন, যা স্থানীয় ভাষায় থ্রং নামে পরিচিত। দুর্গম খাড়া পথ ও পিচ্ছিল রাস্তার কারণে একটি থ্রংয়ে ২০ থেকে ২৫টির বেশি আনারস একবারে বহন করা সম্ভব হয় না। অনেক বাগানে পাঁচ একরের মতো ফসলি জমি থাকলেও উন্নত যোগাযোগের অভাবে সব ফল দ্রুত নামিয়ে আনা যায় না। পাহাড়ের কিছু অংশে ইট বা ঢালাই দিয়ে হাঁটার পথ করা হলেও বেশিরভাগ রাস্তা এখনও মাটির। বর্ষায় ভারী বৃষ্টি হলে গাড়ি ঢুকতে না পেরে পাকা ফল বাজারে পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরের দিন বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আগের দিন বিকেলে বাগান থেকে পাকা আনারস কেটে স্তূপ করা হয়। বড় ও ছোট আনারস আলাদাভাবে বাছাই করা হয়। সম্পূর্ণ লালচে রঙের তুলনায় নির্দিষ্ট পরিপক্ব রঙের বড় আনারসে মিষ্টতা বেশি থাকে। গাছ থেকে কাটার পর সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে এগুলো আরও দুই-তিন দিন সময় নেয়।

পরিশ্রমের তুলনায় বাজারে ফলের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া এই পাহাড়ি চাষিদের নিয়মিত বেদনা। মৌসুমের শুরুতে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি পিস আনারস ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হলেও বাজার খারাপ হলে অনেক সময় দর নেমে আসে ১০ থেকে ১২ টাকায়। স্থানীয় কৃষক লাল থান জানান, দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকেরা পাহাড়ে এসে প্রকৃতির রূপ ও মনোরম আবহ উপভোগ করেন। তবে এই আনন্দের আড়ালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবন কতখানি পরিশ্রমে কাটে এবং ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে তারা কীভাবে টিকে থাকেন, সেই বাস্তবতা অনেকের কাছে অজানা থেকে যায়।

পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পাহাড়ি মাশরুমও জন্মায়। এসব মাশরুম আকারে বেশ বড় ও স্বাদে উন্নত হয়। পাহাড়ি জনপদের পথপ্রান্তে ছোট ছোট স্থানীয় হাট ও বাজার বসে। পাহাড়ের এসব বাজারে শুধু ফলমূল নয়, স্থানীয়দের হস্তশিল্পের নানা উপকরণ কেনাবেচা হয়। বাঁশের তৈরি ট্রে ও কাপ প্রতিটি ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এছাড়া স্থানীয় নারীদের হাতে বোনা রঙিন চাদর পর্যটন মৌসুমে বিশেষ করে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে প্রতিটি ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে অফ-সিজনে পর্যটক কম থাকায় এসব হস্তনির্মিত চাদর ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।