অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
রাজধানী ঢাকার পরিবহন নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন প্রকল্পের লাইন-১ এবং লাইন-৫-এর অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ক্রয় কমিটির বৈঠকে এই মেগা প্রকল্পের মোট আটটি ক্রয় প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্রস্তাবের সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বাকি তিনটি প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এটি একটি বড় আর্থিক অগ্রগতি। অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে লাইন-১-এর সিপি-০২, সিপি-০৬, সিপি-০৯ ও সিপি-১০ প্যাকেজ এবং লাইন-৫-এর সিপি-০৩ প্যাকেজের পূর্তকাজ। অন্যদিকে লাইন-১-এর সিপি-০৪ ও সিপি-০৭ এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের সিপি-০২ প্যাকেজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু লাইন-১-এর চারটি প্যাকেজেই মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
লাইন-১-এর ডিপো ও ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণে বিশাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সিপি-০২ প্যাকেজের আওতায় ওয়ার্কশপ, স্ট্যাবলিং শেড, পরিচালনা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, কারিগরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, সহায়ক উপকেন্দ্র এবং ট্র্যাকশন উপকেন্দ্রসহ ডিপোর সামগ্রিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। মূল্য সংযোজন কর ও শুল্কসহ এতে মোট খরচ হবে চার হাজার ২৮৫ কোটি ছয় লাখ ৯৩ হাজার ৫৫৮ টাকা। প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সিনোহাইড্রো ও এসইবিসিএলের যৌথ উদ্যোগকে এই কাজের জন্য সুপারিশ করা হয়।
বিমানবন্দর রুটে পাতাল রেলের বড় অংশ বাস্তবায়িত হবে সিপি-০৬ প্যাকেজের মাধ্যমে। এর অধীনে নাড্ডা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত পাঁচ দশমিক এক আট দুই কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পথ নির্মিত হবে। এই অংশে দুটি সুড়ঙ্গ এবং বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত নামে তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন তৈরি হবে। টিবিএম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় শ্যাফটও নির্মাণ করা হবে এই প্যাকেজে। ভ্যাট ও করসহ এতে ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ সাত হাজার ২৯৯ টাকা। জাপানের নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডার যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজটি পেয়েছে, যাদের দর প্রাক্কলিত দাপ্তরিক ব্যয়ের তুলনায় ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে ৩২ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ বেশি।
রেল ট্র্যাক ও বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকবে সিপি-০৯ প্যাকেজ। এর আওতায় রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংসহ মূল ট্র্যাকের পাশাপাশি ১৩২ কেভি প্রাথমিক ফিডার, রিসিভিং ও সহায়ক উপকেন্দ্র, ৩৩ ও শূন্য দশমিক চার এক পাঁচ কেভি বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং দেড় হাজার ভোল্টের ওভারহেড বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৭ লাখ ৭২ হাজার ১৫০ টাকা ব্যয়ের এই কাজে যৌথভাবে দায়িত্ব পেয়েছে ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং সুমিতোমো। এই প্রতিষ্ঠানের দর প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে ৪৯ দশমিক নয় দুই শতাংশ বেশি।
স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও টেলিযোগাযোগের আধুনিক প্রযুক্তির সংস্থান রাখা হয়েছে সিপি-১০ প্যাকেজে। এর আওতায় মেট্রোরেলের সিগন্যালিং, টেলিযোগাযোগ, প্ল্যাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা দরজা, অপটিক্যাল ফাইবার সঞ্চালন এবং যোগাযোগভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণের উন্নত প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। ছয় হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ ৩১ হাজার ৭১৬ টাকা ব্যয়ের এই প্যাকেজে ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা মনোনীত হয়েছে, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চেয়ে ৫০ দশমিক আট নয় শতাংশ বেশি।
উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে লাইন-৫ প্রকল্পেও গতি আসছে। সিপি-০৩ প্যাকেজের অধীনে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশমিক ছয় কিলোমিটার এবং নতুন বাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় শূন্য দশমিক নয় কিলোমিটার মিলে মোট সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মিত হবে। এর পাশাপাশি হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারায় পাঁচটি আধুনিক উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। ভ্যাট ও করসহ দুই হাজার ৬৭০ কোটি ৯৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬০ টাকা ব্যয়ের এই কাজের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের সিআরইসি, এমআইএল ও এমবিইএলের যৌথ কনসোর্টিয়াম।
সুপারিশকৃত বাকি তিন প্যাকেজের মধ্যে লাইন-১-এর সিপি-০৪ প্যাকেজে রামপুরা থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত প্রধান লাইন ও স্টেশন নির্মাণে ১৮ হাজার ৩৭ কোটি ২৫ লাখ ৮৯ হাজার ৬৫৬ টাকার প্রাথমিক চুক্তি নির্ধারিত হয়েছে জাপানের টোকিউ-মিল কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে। ট্রানজিশন থেকে বালু নদীর শুরু পর্যন্ত পাঁচ দশমিক শূন্য শূন্য সাত কিলোমিটার লাইন ও স্টেশন নির্মাণে সিপি-০৭ প্যাকেজের দুই হাজার ৫৩৪ কোটি নয় লাখ ৪৩ হাজার ২৪১ টাকার কাজে সিআরইসি-মিল-এমবিইসি জোটকে সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া লাইন-৫ উত্তর রুটের ডিপো নির্মাণে এক হাজার ৮৪৭ কোটি ৫২ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৮ টাকার সিপি-০২ প্যাকেজে কনকর্ড প্রগতি ও কোরিয়ার হ্যানিল ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথভাবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় লাইন-১ ও লাইন-৫ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদিত হয়। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই দুই মেগা প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে যৌথভাবে আর্থিক যোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন