রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কওমি মাদ্রাসায় কেন বাড়ছে বেকারত্ব, সমাধানের পথ কী

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুলাই ২৮, ২০২৬, ০১:০৩ পিএম

কওমি মাদ্রাসায় কেন বাড়ছে বেকারত্ব, সমাধানের পথ কী

Ai - ছবি

দেশের প্রায় ৪০ হাজার কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে অন্তত ৭০ লাখ শিক্ষার্থী। বিপুল সংখ্যক এই শিক্ষার্থীর মাত্র ২ দশমিক ১ ৭ শতাংশ শেষ পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি আনুষ্ঠানিক চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা বিআইজিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য।

কর্মসংস্থানের বাজারে কওমি শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।

প্রতিষ্ঠানটির জরিপ বলছে, কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই কোনো না কোনোভাবে বেকার অথবা আধা-বেকার জীবনযাপন করছেন। দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদে দুজন করেও যদি চাকরি পান, তাহলেও মোট সংখ্যাটি দাঁড়ায় সাত লাখে, যা মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১০ শতাংশ। এদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ ছোটখাটো ব্যবসা বা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। বাকি প্রায় ৩৪ শতাংশের কোনো কাজই নেই।

আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজ উদ্যোগে নতুন মাদ্রাসা গড়ে তুলছেন। দেশে বর্তমানে বেফাকের অধীনে নিবন্ধিত মাদ্রাসার সংখ্যা ৩২ হাজার ৭৩০টি। এর বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হিসাব করলে মোট সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।বৈশ্বিক পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশের এই সংখ্যাটি বিস্ময়কর। পাকিস্তানে ২৭ হাজার মাদ্রাসায় পড়ছে ২৪ লাখ শিক্ষার্থী। ভারতে ২১ হাজার প্রতিষ্ঠানে আছে ২৩ লাখ। আর সারা বিশ্বে দেওবন্দি ধারার যত মাদ্রাসা আছে, তার প্রায় ৬০ শতাংশই এখন বাংলাদেশে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের অলিগলিতে হাঁটলেই দেখা যায়, একটি ছোট ঘর বা শিক্ষকের বাসাবাড়িতেই গড়ে উঠেছে নতুন নতুন মাদ্রাসা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, এসব মাদ্রাসার ৮৫ শতাংশই গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক সুবিধায় পড়াশোনা করে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিনা খরচে বা অল্প খরচে থাকা-খাওয়ার সুবিধার কারণেই মূলত কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি। কিন্তু দীর্ঘ ১২ থেকে ১৫ বছর শুধু আরবি কিতাব পড়ার পর আধুনিক বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জন্য তারা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

একজন শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন রুটিন দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কোরআন হিফজ ও নামাজ দিয়ে দিন শুরু হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টানা আরবি কিতাবের ক্লাস চলে। আসর থেকে এশা পর্যন্ত আবারও পড়াশোনা। এই দীর্ঘ রুটিনে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা কম্পিউটারের কোনো স্থান নেই। নেই কোনো খেলার মাঠ বা মানসিক বিকাশের সুযোগ।

একসময় মুসলিম বিশ্বে মাদ্রাসা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থল।

অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত বাগদাদের বায়তুল হিকমা বা মুস্তানসিরিয়া মাদ্রাসায় কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক ছিল। আধুনিক রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান, অ্যালজেবরার জনক আল খাওয়ারিজমি, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা বা আধুনিক সার্জারির জনক আল জাহরাবির মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীরা এভাবেই উঠে এসেছিলেন। তারা প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞান চর্চা করলে ধর্মীয় বিশ্বাস নষ্ট হয় না, বরং স্রষ্টার সৃষ্টিকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

সেই চিত্র এখন আর নেই।

১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ ভারতে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সময় মূলত ধর্মীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখার প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। সেই ব্রিটিশ আমলের প্রণীত ‍‍`দরসে নিজামী‍‍` পাঠ্যক্রমেই আজও চলছে দেশের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসা। ২০২৬ সালের আধুনিক বিশ্বে চলার জন্য যে ডিজিটাল বা ফিনান্সিয়াল লিটারেসি প্রয়োজন, তার কোনো সুযোগ এই শিক্ষাব্যবস্থায় রাখা হয়নি।

শিক্ষকদের জীবনমান ও প্রশিক্ষণ পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। অধিকাংশ শিক্ষক মাসে তিন থেকে আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি বা শিশু মনোবিজ্ঞান নিয়ে তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ব্যক্তিগত দান, জাকাত বা কোরবানির চামড়ার টাকায় চলা এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো স্থায়ী আর্থিক কাঠামো নেই।অবকাঠামোগত দিক থেকেও মাদ্রাসাগুলো অনেক পিছিয়ে। একটি ছোট কক্ষে অনেক শিক্ষার্থীর গাদাগাদি করে থাকা, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং কোনো ধরনের সরকারি নজরদারি না থাকায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে শিশুদের দিয়ে রাস্তায় চাঁদা তোলানো বা চামড়া সংগ্রহের মতো কাজ করানো হচ্ছে, যা শিশুশ্রমের পর্যায়ে পড়ে।

সরকারি অডিট বা নিয়ন্ত্রণের বাইরেই চলছে সবকিছু।

২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর নিচের ১০ থেকে ১২ বছরের পড়াশোনার কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। ফলে মাঝপথে কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিলে তার সেই শিক্ষাজীবনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য থাকে না। তারা না পারে কলেজে ভর্তি হতে, না পারে সাধারণ কোনো সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে।আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও সেখানেও বিজ্ঞান শিক্ষার বেহাল দশা। মাত্র ২৫ শতাংশ আলিয়া মাদ্রাসায় বিজ্ঞানাগার রয়েছে। ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে ভয় পায় এবং বিজ্ঞানবিমুখ হয়ে পড়ে। সাধারণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করার সুযোগ না পেয়ে অনেকেই আধুনিক বিজ্ঞানকে অন্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

বিশ্বমানের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ র্যাংকিং নির্ভর করে গবেষণা, প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও পিএইচডি প্রোগ্রামের ওপর। কেবল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেই প্রাতিষ্ঠানিক মান বাড়ে না।বিশেষজ্ঞ ও আলেম সমাজের অনেকেই এখন মনে করেন, কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম আধুনিক করা জরুরি। 

সরকারি নিবন্ধনের আওতায় এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা গেলে এই শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা সম্ভব।৭০ লাখ শিশু-কিশোর দেশের বিশাল এক মানবসম্পদ। উপযুক্ত সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীই আগামী দিনে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।