এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর এমপিদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই দাবির বিপরীতে তীব্র প্রতিবাদ ও কড়া সমালোচনা করেছেন এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। বুধবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এমপিদের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন এবং বিষয়টি নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন তোলেন।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এমপিদের এই দাবিকে তিনি অযৌক্তিক ও স্বার্থপরতা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তাসনিম জারা তাঁর লেখায় দেশের বিভিন্ন পেশাজীবীদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, শিক্ষকেরা দিনের পর দিন রাস্তায় বসে থাকেন তাদের ন্যায্য বেতনের দাবিতে এবং ডাক্তার ও নার্সরা অধিকার আদায়ে আন্দোলন করছেন। সরকারি কর্মচারীরা বছরের পর বছর ধরে পে-স্কেল সংশোধনের অপেক্ষায় থাকলেও কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীরা চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন দেশ একযোগে কয়েকটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এমপিরা সংসদে বসে নিজেদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও গাড়ি নিয়ে আলোচনা করছেন। এই এক ইস্যুতে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে দ্রুততা ও ঐক্য দেখা গেছে, তা জনগণের মৌলিক সমস্যায় সচরাচর দেখা যায় না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, এমপিরা সংসদে গিয়েছেন জনগণের সমস্যা সমাধান করতে, নিজেদের প্রাপ্তির হিসাব কষতে নয়।এমপিদের বেতন-ভাতা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও কঠোর আপত্তি জানিয়েছেন তাসনিম জারা।
তিনি মনে করেন, এমপিদের বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা তারা নিজেরাই ঠিক করবেন, এটি নীতিগতভাবেই একটি বড় ভুল। পৃথিবীর কোনো পেশাতেই মানুষ নিজের বেতন নিজে ঠিক করে না, কারণ এতে সরাসরি স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ডাক্তার, শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন, যাদের বেতন আলাদা বোর্ড বা কমিশন ঠিক করে দেয়। এমপিদের সুযোগ-সুবিধা যেহেতু জনগণের করের টাকা থেকে আসে, তাই সেই টাকার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা কেবল তাদের হাতে থাকা অগ্রহণযোগ্য বলে তিনি দাবি করেন।
এই সমস্যার সমাধানে তাসনিম জারা একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এই কমিটি এমপিদের দায়িত্ব, ঝুঁকি এবং যোগ্যতার সঙ্গে অন্যান্য পেশাজীবী যেমন জেলা জজ, সচিব বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তুলনা করে একটি যৌক্তিক বেতন ও সুবিধা কাঠামো তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, কমিটির কাজ কেবল সুবিধা বাড়ানো বা কমানো নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতায় কোনটা প্রাসঙ্গিক তা বিচার করা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন এমপির জন্য যাতায়াত ভাতা বা অফিস সুবিধা বাড়ানো দরকার হতে পারে, কিন্তু বিলাসবহুল শুল্কমুক্ত গাড়ির মতো সুবিধাগুলো আজকের দিনে যৌক্তিকতা হারিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রস্তাবিত এই কমিটিতে কেবল আমলা বা বিশেষজ্ঞ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক, একজন নার্স এবং একজন ছোট ব্যবসায়ীকে এই কমিটিতে রাখা উচিত। কারণ এমপিদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অনুপাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তাসনিম জারা এমপিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বেতন নিজে ঠিক করা একটি অস্বস্তিকর ও মর্যাদাহানিকর বিষয়। তাই স্বচ্ছতা ও সম্মানের খাতিরে এমপিদের উচিত নিজেরাই একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন