অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
ওলকচু দিয়ে হাঁসের মাংসের যুগলবন্দি গ্রামীণ বাংলার রন্ধন ঐতিহ্যের একটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও ব্যতিক্রমী পদ। অনেকেই ওলকচু রান্না করতে গিয়ে গলা চুলকানোর ভয়ে পিছিয়ে যান। তবে সঠিক পদ্ধতিতে ভাপ দিয়ে পানি ঝরিয়ে এবং তেঁতুলের সঠিক ব্যবহারে এই সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করে চমৎকার স্বাদের মাংস রান্না করা সম্ভব। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ অঞ্চলের গ্রামীণ রন্ধনশিল্পী জুলেখা বেগমের হাত ধরে এই বিশেষ রান্নার ঐতিহ্যবাহী কৌশল ও পুষ্টিগুণের নানা দিক সামনে এসেছে।
ওলকচুর প্রাচীন নাম ওল্ল, যা কালক্রমে ওল নামে পরিচিত হয়েছে।
পুষ্টিবিজ্ঞানের দিক থেকেও ওলকচুর গুরুত্ব অপরিসীম। এতে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফ্যাট, ফলেট, ভিটামিন এ, বি ও সি রয়েছে। পাশাপাশি নিয়াসিন, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, জিংক, কপার ও ফাইবারের চমৎকার উৎস এই কন্দজাতীয় সবজি। সর্দি, কাশি, কফ, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের পীড়া, কৃমি, আমাশা, গেঁটেবাত এবং পাইলস বা অর্শরোগের মতো সমস্যা নিরাময় ও প্রতিরোধে ওলকচুর বিভিন্ন ওষধি গুণের কথা প্রচলিত রয়েছে। অন্যদিকে হাঁসের মাংস প্রোটিনের খুব সমৃদ্ধ উৎস হলেও এতে গরুর মাংসের তুলনায় চর্বির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে, যা মাঝে মাঝে পরিমিত পরিমাণে খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি সিক্স, বি টুয়েলভ, সেলেনিয়ামসহ নানা খনিজ উপাদানের জোগান দেয়।
রান্নার শুরুতেই ওলকচুর শক্ত বহিরাবরণ পরিষ্কার করে মাঝারি টুকরো করে কেটে নিতে হয়। এরপর গরম পানিতে সামান্য হলুদ গুঁড়া ও লবণ দিয়ে ওলকচুর টুকরোগুলো ভালোভাবে সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে ধুয়ে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সেদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় ওলের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর উপাদান অনেকটাই দূর হয়ে যায়।
গলা চুলকানোর মূল কারণ হলো ওলকচুতে থাকা ক্যালসিয়াম অক্সালেট নামক রাসায়নিক উপাদান।
কড়াইতে তেল গরম করে প্রথমে পেঁয়াজ কুচি ও ফালি করা কাঁচা মরিচ ভালোমতো ভেজে নিতে হয়। এরপর একে একে দারুচিনি, সাদা এলাচ, কালো এলাচ, তেজপাতা ও আস্ত জিরা দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে সুবাস ছড়াতে হবে। পরবর্তীতে যুক্ত করতে হয় বাটা মসলা—রসুন বাটা, আদা বাটা, পেঁয়াজ বাটা ও জিরা বাটা। মসলা কিছুটা কষিয়ে নিয়ে পরিমাণমতো লবণ, মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া ও ধনিয়ার গুঁড়া দিয়ে সামান্য পানি সহযোগে কষিয়ে নিতে হয়।
মসলা কষানো হলে তাতে কেটে রাখা হাঁসের মাংসের টুকরো ছেড়ে দিয়ে ভালোভাবে কষাতে হবে। মাংস কিছুটা সেদ্ধ হয়ে এলে আগে থেকে সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে রাখা ওলকচুর টুকরোগুলো দিয়ে মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে ঢাকনা দিয়ে কিছুক্ষণ মাঝারি আঁচে রান্না করতে হয়। রায়গঞ্জ অঞ্চলে ঝোলের প্রচলিত নাম `সুরা`, তাই মাংস ও কচু ভালোভাবে কষানোর পর ঝোলের জন্য পর্যাপ্ত পানি যোগ করতে হয়।
রান্নার শেষের দিকে পাকা তেঁতুল সামান্য পানিতে চটকে সেই ক্বাথ ঝোলের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তেঁতুলের অম্লীয় উপাদান ক্যালসিয়াম অক্সালেটকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, যার ফলে তরকারি খাওয়ার সময় গলায় কোনো ধরনের চুলকানি বা অস্বস্তি তৈরি হয় না। সবশেষে ঝোল ঘন হয়ে এলে চুলা থেকে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা যায় জিভে জল আনা এই গ্রামীণ তরকারি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন