শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬,
ইসলামের ইতিহাস

হজরত নুহের নৌকা কত বড় ছিল এবং ঐতিহাসিক সত্যতা কী

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৯, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

হজরত নুহের নৌকা কত বড় ছিল এবং ঐতিহাসিক সত্যতা কী

হজরত নুহের (আ.) ঘটনা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সবচেয়ে শিক্ষণীয় ঘটনাগুলোর একটি। তাঁর জাতির অবাধ্যতা, দীর্ঘদিনের দাওয়াত, নির্যাতন এবং এরপর মহাপ্লাবন সবকিছুই মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। কিন্তু এই ঘটনার একটি বিষয় সাধারণ মানুষের মনে বিশেষ কৌতূহল তৈরি করে যে, নৌকায় নুহ (আ.) মুমিনদের ও বিভিন্ন প্রাণীর এক জোড়া করে তুলে নিয়েছিলেন, সেটি আসলে কত বড় ছিল? পবিত্র কোরআনে নৌকার নির্দিষ্ট কোনো মাপ উল্লেখ করা হয়নি। তবে তাফসির ও ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ও কাঠামো সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

হজরত নুহ (আ.) বর্তমান ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলের মানুষদের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর সময়ে সমাজব্যবস্থা ধীরে ধীরে নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে শুরু করে। মানুষের মধ্যে সামাজিক বিভাজনও তৈরি হয়। একদিকে ছিল অভিজাত শ্রেণি, অন্যদিকে নিম্নশ্রেণির মানুষ। অভিজাতরা নিম্নশ্রেণির মানুষের ওপর নানা ধরনের জুলুম-নির্যাতন চালাত এবং তাদের তুচ্ছ মনে করত। তাদের জীবনযাপনেও নৈতিকতার পরিবর্তে প্রবৃত্তির প্রাধান্য ছিল। তারা বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত।

নুহ (আ.) তাদের এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করলেন। কিন্তু তাঁর জাতির নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরোধিতা শুরু করল। তারা মানুষকে নুহের (আ.) দাওয়াত থেকে দূরে রাখত এবং নিজেদের উপাসনা আঁকড়ে ধরে থাকতে বলত। নুহ (আ.) এত বাধা সত্ত্বেও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেলেন। দিনের পর দিন তিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকলেন। কিন্তু তাঁর কওমের নেতাদের অত্যাচারও বাড়তে থাকল। এক সময় নুহ (আ.) আল্লাহর কাছে কাতর হয়ে তার জাতির ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালার আবেদন করেন।

অবশেষে আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন, নুহের (আ.) জাতির মধ্যে যারা ইমান এনেছে, তারা ছাড়া আর কেউ ইমান আনবে না। তখন তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা হজরত নুহকে (আ.) একটি বিশাল নৌকা তৈরি করার নির্দেশ দিলেন। কীভাবে সেই নৌকা তৈরি করতে হবে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে তা শিখিয়ে দিলেন। নুহ (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নৌকা তৈরি করতে শুরু করলেন। নৌকা তৈরি করতে দেখে তার জাতির লোকেরা হাসিঠাট্টা করতে লাগল। তারা খোঁচা মেরে বলত, এতদিন ছিলেন নবী, এখন হয়েছেন কাঠমিস্ত্রি! কিন্তু নুহ (আ.) তাদের বিদ্রূপে থামলেন না। তিনি জানতেন, এটি তার নিজের কোনো পরিকল্পনা নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ।

নৌকাটির মাপ নিয়ে তাফসিরের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নৌকার দৈর্ঘ্য ছিল বারোশ হাত, প্রস্থ ছয়শ হাত এবং উচ্চতা ত্রিশ হাত। তিনি আরও বলেন, নৌকাটি ছিল তিনতলা। নিচের তলায় রাখা হয়েছিল কীট-পতঙ্গ ও জন্তু-জানোয়ার, মাঝের তলায় মানুষ এবং ওপরের তলায় পাখি। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

নৌকা বানানো শেষ হলে আল্লাহ তাআলা নুহকে (আ.) নির্দেশ দিলেন, যখন আমার নির্দেশ আসবে এবং চুলা উথলে উঠবে, তখন প্রত্যেক জীবের এক জোড়া এবং তোমার পরিবার-পরিজনকে নৌকায় তুলে নেবে। অবশেষে সেই দিন এসে গেল। নুহ (আ.) মুমিনদের নিয়ে নৌকায় উঠলেন। বর্ণনা অনুযায়ী, নারী-পুরুষ মিলিয়ে আশি জন মুমিন এবং বিভিন্ন পশু-পাখি নৌকায় আশ্রয় নিল। এরপর আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। একই সঙ্গে মাটির নিচ থেকেও পানি বেরিয়ে আসতে লাগল। ওপরের পানি ও নিচের পানি মিলিত হয়ে চারদিক প্লাবিত করে ফেলল। পানি এত উঁচুতে উঠল যে, বর্ণনা অনুযায়ী সবচেয়ে উঁচু পাহাড়েরও পনেরো হাত ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছিল।

নুহের (আ.) বিশাল নৌকা তখন উত্তাল পানির ওপর ভেসে চলেছে। পৃথিবীর যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় অটল ছিল, তাদের কেউ এই আজাব থেকে রক্ষা পেল না। নুহের (আ.) নৌকা দীর্ঘ সময় পানির ওপর ভেসে থাকার পর অবশেষে জুদি পাহাড়ে এসে থামল। বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকাটি দেড়শ দিন ভেসে থাকার পর মুহাররমের দশ তারিখে জুদি পাহাড়ে নোঙর করে।

তবে হজরত নুহের (আ.) নৌকার পরিমাপ, জুদি পাহাড়ে থামা এবং ১০ই মুহাররমে নৌকা থামা—এসব বিষয়ে যেসব বর্ণনা প্রচলিত আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই বানোয়াট ও অতিরঞ্জিত। তাফসিরগ্রন্থসমূহে ইবনে আব্বাসের (রা.) নাম উল্লেখ করে এসব কথা বলা হলেও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এসব বর্ণনা আসেনি বলে গবেষকরা মনে করেন। তাই নৌকার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বা অন্যান্য পরিমাপকে নিশ্চিত সত্য মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রকৃত পরিমাপ কত ছিল, তা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন। কোরআন-হাদিসে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না আসার কারণও স্পষ্ট—এই ঘটনায় নৌকাটি মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো নুহের (আ.) কওমের ওপর আল্লাহর আজাব এবং তার পরিণতি। তাই আমাদের দৃষ্টি এই ঘটনার শিক্ষা ও সতর্কবার্তার দিকে দেওয়া দরকার।