অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১১:১৫ এএম
পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় প্রকৃত আলেম কেবল তথ্যের প্রাচুর্য বা অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী কোনো ব্যক্তি নন। বরং তাঁর অর্জিত জ্ঞান তাঁকে আল্লাহভীরু, সত্যনিষ্ঠ, বিনয়ী, গভীর বিচক্ষণ এবং ঐশী বিধানের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী এক আত্মায় রূপান্তরিত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে প্রকৃত আলেমের ১০টি অনন্য গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথম গুণটি হলো আল্লাহর প্রতি তাদের সীমাহীন ভয় বা তাকওয়া। প্রকৃত আলেমরা আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন। সুরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।
দ্বিতীয় গুণ হলো সৃষ্টির মধ্যে তাদের সর্বোত্তম বা শ্রেষ্ঠ অবস্থান।
সুরা বাইয়্যিনাহর ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারাই সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম। সহিহ বুখারির ৭৩১২ নম্বর হাদিসে এসেছে, আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বিনের গভীর জ্ঞান দান করেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির মঙ্গল চাইলে আল্লাহ তাকে ধর্মের মর্ম অনুধাবনের তাওফিক দেন। বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনু জামাআহ আল-কিনানি উল্লেখ করেছেন যে, যারা আল্লাহকে ভয় করেন তারাই প্রকৃত আলেম এবং তারাই সৃষ্টির সেরা জীব। ফলে স্বভাবতই আলেমরাই সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী।
তৃতীয় গুণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে তাদের সুউচ্চ স্তর ও অনন্য মর্যাদা। সুরা মুজাদালাহর ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন।
চতুর্থ গুণ হলো তারা ‘উলিল আমর’ বা কর্তৃত্বশীল দায়িত্বশীলদের অন্তর্ভুক্ত। সমাজে যেকোনো জটিল সংকট ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঠিক সমাধানের জন্য সাধারণ মানুষকে তাদের কাছে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা নিসার ৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তারা যদি তা রাসুল ও তাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে ফিরিয়ে দিত, তাহলে তাদের মধ্যে যারা বিষয়টি অনুসন্ধান করে বুঝতে সক্ষম, তারা তা জানতে পারত।
পঞ্চম গুণ হলো মর্যাদা ও পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে কোনো সাধারণ মানুষ তাদের সমকক্ষ হতে পারে না।
সুরা যুমারের ৯ নম্বর আয়াতে সমতার এই ধারণা নাকচ করে বলা হয়েছে, বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান?
ষষ্ঠ গুণ হিসেবে বলা হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য তারা জ্ঞান ও দিকনির্দেশনার আশ্রয়স্থল। যেকোনো অজানা বিষয় ও জটিল জিজ্ঞাসার সমাধানে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সুরা আম্বিয়ার ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।
সপ্তম গুণ হলো আল্লাহর নিদর্শন ও গভীর উদ্দেশ্যের সঠিক উপলব্ধি। সাধারণ মানুষের চেয়ে আলেমরা ঐশী বাণীর মর্ম অনেক সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করতে পারেন। সুরা আনকাবুতের ৪৩ নম্বর আয়াতে এসেছে, আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি; কিন্তু আলেমরাই তা অনুধাবন করে। সুরা আলে ইমরানের ৭ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছে, যারা জ্ঞানে সুদৃঢ়, তারা বলে আমরা এতে ঈমান এনেছি, সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে।
অষ্টম গুণ হলো ঐশী আদালতে তাদের দেওয়া সাক্ষ্যের অপরিসীম মর্যাদা।
সুরা আলে ইমরানের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রথমে নিজের সাক্ষ্য, তারপর ফেরেশতাদের সাক্ষ্য এবং এরপরই জ্ঞানীদের সাক্ষ্যের মহিমা উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; ফেরেশতা এবং জ্ঞানীরাও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
নবম গুণ হলো জ্ঞানের অবিরাম সাধনা ও প্রার্থনার নির্দেশনা। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে পার্থিব কোনো কিছু বৃদ্ধির আদেশ করেননি, কেবল জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। সুরা ত্বহার ১১৪ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর বলুন, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।
দশম গুণটি হলো অকল্যাণ, বিপর্যয় ও তার পরিণতি সম্পর্কে আলেমদের গভীর সচেতনতা ও দূরদর্শিতা। সুরা নাহলের ২৭ নম্বর আয়াতে এই সত্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়েছিল, তারা বলল, আজ লাঞ্ছনা ও অকল্যাণ কাফিরদের ওপরই পতিত হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন