অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম
একজন মুমিন মুসলমানের দৈনন্দিন প্রার্থনার তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবেদন হলো পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে সঠিক পথের সন্ধান চাওয়া। পার্থিব জীবনে একজন মানুষ সবকিছু অর্জন করার পরও যদি সত্য ও ন্যায়ের সঠিক পথ হারিয়ে ফেলে, তবে তার সার্বিক সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই কারণেই পবিত্র কোরআনের উদ্বোধনী সুরা ফাতিহায় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতিনিয়ত এই দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন।
সুরা ফাতিহার ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের সরল পথ দেখান।’ এই মিনতি শুধু পথ চেনার সাধারণ কোনো আবেদন নয়; বরং পরম সত্যকে অনুধাবন করা, তা হৃদয়ে ধারণ করা, তদনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং আমৃত্যু সেই আদর্শে অবিচল থাকার গভীর এক প্রার্থনা। পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে সরল পথ নিছক কোনো দার্শনিক নৈতিক ভাবনা নয়, বরং এটি পরিপূর্ণ দ্বিনের একটি বাস্তব রূপরেখা।
আরবি ‘সিরাত’ শব্দের অর্থ পথ এবং ‘মুস্তাকিম’ শব্দের অর্থ সোজা বা বক্রতামুক্ত। কোরআনের সামগ্রিক পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম হলো আল্লাহর মনোনীত দ্বিন, তাওহিদ, তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্য এবং রাসুলুল্লাহর (সা.) নির্দেশিত সুন্নতের এক সমন্বিত রূপ। মহান রবের সার্বিক হুকুম এবং নবীর আদর্শের আলোকেই এই পথ গড়ে ওঠে। সুরা ইয়াসিনের ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আর তোমরা আমারই ইবাদত করো। এটিই সরল পথ।’ প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর জন্যই ইবাদত নির্দিষ্ট করা, তাঁর বিধান মেনে চলা এবং শয়তানের সব অবাধ্যতামূলক প্ররোচনা বর্জন করাই হলো সত্য দ্বিন ও সঠিক পথ। অর্থাৎ তাওহিদের দৃঢ় ভিত্তিই এই সরল পথের মূল সূচনা।
সিরাতুল মুস্তাকিমের অন্তর্নিহিত গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি জীবন্ত উপমা তুলে ধরেছেন।
তিরমিজি শরিফের ২৮৫৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) জানিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা সোজা পথের একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন—একটি সরল পথের দুই পাশে দুটি সুউচ্চ প্রাচীর রয়েছে। প্রাচীর দুটিতে রয়েছে অসংখ্য উন্মুক্ত দরজা, যেগুলোর সামনে হালকা পর্দা ঝোলানো। সেই সোজা রাস্তার প্রবেশমুখে একজন আহ্বানকারী দাঁড়িয়ে সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছেন এবং ওপর থেকেও আরেকজন আহ্বানকারী ডাকছেন। সুরা ইউনুসের ২৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহ তাআলা শান্তিময় আবাসের দিকে ডাকছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সোজা পথের হেদায়েত দান করেন।’
হাদিসের ব্যাখ্যামতে, পথের দুই ধারের দরজাগুলো হলো আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখা। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করতে উদ্যত হলেই সেই পর্দা সরে যায়। আর ওপর থেকে যে আহ্বানকারী ডাকেন, তিনি হলেন মানুষের বিবেকে থাকা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত উপদেশদাতা।
এই অনন্য দৃষ্টান্ত স্পষ্ট করে দেয় যে, জীবনের কোনো পরিস্থিতিতেই শরিয়তের নির্ধারিত সীমানা ও দ্বিনের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হওয়ার অবকাশ নেই। সুরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর, তাঁর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদেরও।’
পরবর্তী সময়ে সুরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে সেই মহান সঙ্গীদের কথা, যাদের পথ অনুসরণীয়। সেখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা আখিরাতে নবীগণ, সত্যনিষ্ঠ সিদ্দিকগণ, দ্বিনের পথে আত্মোৎসর্গকারী শহীদগণ এবং সৎকর্মশীলদের পরম সান্নিধ্য লাভ করবে। সুরা ফাতিহায় সঠিক পথের যে আকুতি মুমিনরা প্রতিদিন বারবার জানান, তা গোটা মানবজীবনের জন্য এক পথনির্দেশক সনদ, যা মানুষকে আজীবন কোরআন ও সুন্নাহর অনুসারী হয়ে বেঁচে থাকার শিক্ষা দেয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন