অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
আজানের জবাব দেওয়া নিষেধ এমন কিছু সুনির্দিষ্ট অবস্থা ও সময়ের বিবরণ ইসলামি ফিকহে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের উদ্দেশ্যে মুয়াজ্জিনের উচ্চারিত আহ্বান ইসলামি জীবনব্যবস্থার এক অনন্য নিদর্শন। ইসলামে আজানের মর্যাদা যেমন অপরিসীম, তেমনি যিনি আজান দেন তার জন্যও ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ সম্মান।
মুয়াজ্জিনের ফজিলত বর্ণনা করে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি যত দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তত দূর পর্যন্ত তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এমনকি প্রতিটি সজীব প্রাণী ও নির্জীব বস্তু, যারা এই আজানের সুর শুনতে পায়, কিয়ামতের দিন সবাই তার ঈমানের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। সুনানে আবু দাউদের ৫১৫ নম্বর হাদিসে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
সুনানে নাসায়ির ২৫৪ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেশতারা প্রথম কাতারে নামাজ আদায়কারীদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন। মুয়াজ্জিন আজানের ধ্বনির ব্যাপ্তি অনুযায়ী ক্ষমা লাভ করেন এবং জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের সমপরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হন।
শরিয়তের বিধানে আজান দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা হলেও এর মৌখিক উত্তর দেওয়া সুন্নতে মুস্তাহাব।
আজানের জবাব দেওয়ার বিশুদ্ধ পদ্ধতি হলো, মুয়াজ্জিন প্রতিটি বাক্য শেষ করে থামার পর শ্রোতা নিজে সেই বাক্যটি পুনরাবৃত্তি করবেন। তবে মুয়াজ্জিন যখন ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ এবং ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ পাঠ করবেন, তখন শ্রোতাকে ‘লা হাওলা ওয়া লা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলতে হবে, যা সহিহ মুসলিমের ৩৮৫ নম্বর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যদিও আল-মুজামুল আওসাত আত-তাবারানির ৪৫৮ নম্বর হাদিসে মুয়াজ্জিনের অনুরূপ বাক্য উচ্চারণের অবকাশও বর্ণিত রয়েছে।
মুয়াজ্জিনের সমপরিমাণ সওয়াব অর্জনের পথ বাতলে দিয়ে সুনানে আবু দাউদের ৫২৪ নম্বর হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, মুয়াজ্জিন যা বলেন শ্রোতাও যদি হুবহু তা বলে এবং আজান শেষে দোয়া পাঠ করে, তবে সে-ও সেই অনুপম প্রতিদান লাভ করবে।
তবে আজানের ফজিলত যতই ব্যাপক হোক না কেন, কিছু বিশেষ অবস্থায় এর উত্তর দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়।
ঐতিহ্যবাহী কৌড়িয়া মাদ্রাসার প্রধান মুফতি ও মুহাদ্দিস মাওলানা হেলাল আসহাব কাসেমি ফিকহি নির্দেশনার আলোকে জানান, প্রধানত চারটি পরিস্থিতিতে আজানের জবাব দেওয়া বৈধ নয়।
প্রথমত, আজান চলাকালে কোনো ব্যক্তি যদি ইতিমধ্যে নামাজে রত থাকেন, তবে নামাজ অবস্থায় আজানের উত্তর দেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত, জুমার খুতবা কিংবা বিয়ের খুতবা পাঠের সময় আজানের জবাব দেওয়া নিষিদ্ধ।
তৃতীয়ত, স্বামী-স্ত্রীর সহবাসকালে আজানের উত্তর দেওয়া যাবে না।
চতুর্থত, শৌচাগারে অবস্থানকালীন কিংবা প্রস্রাব-পায়খানা করার মুহূর্তে আজানের জবাব দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
এর পাশাপাশি এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে আজানের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে না দেওয়ার অবকাশ রয়েছে, যদিও সেখানে বিকল্প ও উত্তম আমলের সুযোগ বিদ্যমান।
যেমন ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা বা শরিয়তের মাসআলা-মাসায়েল শেখা ও শেখানোর সময় আজানের জবাব না দেওয়ার সুযোগ রয়েছে; তবে আলোচনায় বিরতি দিয়ে জবাব দেওয়া অথবা উপস্থিত সবার পক্ষ থেকে অন্তত একজনের উত্তর দিয়ে দেওয়া উত্তম।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সময় আজান শোনা গেলে তেলাওয়াত অব্যাহত রাখার অবকাশ থাকলেও তা সাময়িক বন্ধ রেখে আজানের জবাব দেওয়াই শ্রেয় বলে ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়ার দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে খাবার গ্রহণের সময় আজানের উত্তর স্থগিত রাখার সুযোগ থাকলেও আদ্দুররুল মুখতারের প্রথম খণ্ডের ৩৯৭ নম্বর পৃষ্ঠার বিবরণ অনুযায়ী খাবার গ্রহণ কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে মুয়াজ্জিনের আহ্বানের জবাব দেওয়াই সর্বাধিক উত্তম আমল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন