সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬,

আদালতের হস্তক্ষেপে ছেলের ঘরে ফিরলেন মা ভরণপোষণের দায়িত্ব নিল সন্তান

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১২, ২০২৬, ১১:৪২ এএম

আদালতের হস্তক্ষেপে ছেলের ঘরে ফিরলেন মা ভরণপোষণের দায়িত্ব নিল সন্তান

আদালতের হস্তক্ষেপে ছেলের ঘরে ফিরলেন মা, যিনি এতদিন চরম অনীহা ও বিরোধের কারণে নিজের সন্তানের কাছে আশ্রয় পাচ্ছিলেন না। পাবনার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের সরাসরি হস্তক্ষেপে সাঁথিয়ার এই পারিবারিক সংকটের অবসান ঘটেছে। একই সঙ্গে বৃদ্ধা মায়ের যাবতীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন গ্রামপুলিশ হিসেবে কর্মরত ছেলে সাগর হোসেন (৩০)। সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পঞ্চাশ বছর বয়সী বৃদ্ধা মুন্নী খাতুনকে নিজের ঘরে রেখে দেখাশোনা করতে রাজি ছিলেন না নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ সাগর হোসেন।

সন্তানের আশ্রয় ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে একাধিকবার ঘুরেছিলেন এই অসহায় মা। কয়েক দফা স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সুরাহা হয়নি। অবশেষে জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে একমাত্র অবলম্বন সন্তানের সঙ্গে থাকার অধিকার চেয়ে তিনি সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ উভয় পক্ষকে নিয়ে নিজ কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানি গ্রহণ করেন।

শুনানিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাগরকে বুঝিয়ে বলেন যে একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সন্তানের মৌলিক দায়িত্ব। মানবিক দিক বিবেচনা করে মাকে কাছে রাখার জন্য তিনি বারবার অনুরোধ জানান।

কিন্তু ছেলে সাগর হোসেন মাকে নিজের ঘরে রাখতে সম্পূর্ণ অনড় অবস্থান নেন। শুনানির একপর্যায়ে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেন, মাকে তার সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা হলে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন। মাকে ঘরে তোলা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি মাসে কত টাকা দিতে হবে তা নির্ধারণ করে দিতে বলেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই শুনানির একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

ঘটনাটি নজরে আসে পাবনার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁথিয়া থানার আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের। আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নেন এবং রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন মা ও ছেলেকে সশরীরে এজলাসে হাজির করার জন্য।

আদালতের নির্দেশ পেয়ে পুলিশ তাদের নিজেদের গাড়িতে করে আদালতে নিয়ে যায়। বিজ্ঞ বিচারক অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে মা ও ছেলের সব বক্তব্য শোনেন এবং আইনি ও নৈতিক দিকগুলো তুলে ধরে বিরোধ মীমাংসা করে দেন।

বিচারকের মানবিক মধ্যস্থতায় নিজের ভুল পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেন ছেলে সাগর হোসেন। তিনি এজলাসেই মাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন এবং নিজের অশোভন আচরণের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ভবিষ্যতে মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ আর কখনো করবেন না বলেও লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

আদালতের এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করে বৃদ্ধা মা মুন্নী খাতুন জানান, তার ছেলে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়েছে। সন্তানের কাছে পরম শান্তিতে থাকতে পারার চেয়ে বড় আনন্দ একজন মায়ের জীবনে আর কিছু হতে পারে না।

নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত সাগর হোসেন জানান, বিচারক তার ভুলগুলো স্পষ্টভাবে ধরিয়ে দিয়েছেন। অতীতে মাকে অসম্মান করা যে চরম অন্যায় হয়েছে তা স্বীকার করে তিনি বাকি জীবন মাকে ছায়ার মতো আগলে রাখার অঙ্গীকার করেন।