অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১১:১০ এএম
বিয়েতে যৌতুক হিসেবে সোলার প্যানেল ও শক্তিশালী ব্যাটারি দাবি করার এক অভিনব প্রবণতা শুরু হয়েছে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানে। দেশটিতে অসহনীয় লোডশেডিং থেকে বাঁচতে কনেপক্ষের কাছে প্রচলিত সামগ্রীর পরিবর্তে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও আধুনিক সৌর সরঞ্জাম উপহার হিসেবে আবদার করছে বরপক্ষ। বিয়ে শেষে নতুন সংসারকে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগমুক্ত রাখতে পরিবারগুলোর কাছে এটি এখন সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও ব্যবহারিক উপহার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দৈনন্দিন নাগরিক জীবন পুরোপুরি থমকে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় সেখানকার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নিয়মিত উৎপাদন সচল রাখতে পারছে না। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সময়মতো কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় নগরবাসী বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন। গ্রিডের ওপর আস্থা হারিয়ে সাধারণ পরিবারগুলো এখন সরাসরি কম খরচের সৌর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
চীনা প্রযুক্তির সুলভ মূল্য এবং পর্যাপ্ত জোগান দেশটিতে এক অভাবনীয় রূপান্তর এনে দিয়েছে।
স্থানীয় বাজারে প্রতি ওয়াট সোলার প্যানেলের গড় দাম কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাকিস্তান চীন থেকে ১৩ দশমিক ৫ গিগাওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল আমদানি করে, যা ছিল ২০২২ সালের মোট আমদানির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। পাকিস্তান সোলার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই দেশটিতে আমদানি হয়েছে ২৮ গিগাওয়াট ক্ষমতার প্যানেল। ২০১৮ সালে যেখানে পাকিস্তানের বার্ষিক মোট সৌর সরঞ্জাম আমদানি ছিল এক গিগাওয়াটেরও কম, সেখানে ২০২৬ সালের শুরুতে সেই আমদানির অঙ্ক রেকর্ড ৫১ গিগাওয়াট অতিক্রম করেছে।
উৎপাদনের চিত্রেও এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে নেট মিটারিং ব্যবস্থায় সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন শূন্য দশমিক ৭৫ গিগাওয়াট হিসেবে নথিবদ্ধ থাকলেও, অন-গ্রিড ও অফ-গ্রিড মিলিয়ে সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যে ৩২ গিগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ২০২০ সালের শুরুতে দেশটির মোট জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের মাত্র চার শতাংশ আসত সৌর উৎস থেকে, যা এক লাফে বেড়ে এখন ২১ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানি বাবদ পাকিস্তানের সাশ্রয় হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। কেবল ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই সৌর শক্তি থেকে উৎপাদন হয়েছে ৪ দশমিক ৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবার সরাসরি সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে।
করাচির বৃহত্তম শিল্প এলাকার প্রায় প্রতিটি কারখানার ছাদ এখন ঢেকে গেছে সুবিশাল সোলার প্যানেলে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে চীন থেকে লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ৩৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার।
তবে সাধারণ মানুষের এই সৌরমুক্তি দেশটির প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য তৈরি করেছে নতুন সংকট।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো চরম আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছে। লাখ লাখ গ্রাহক গ্রিড ছেড়ে নিজস্ব সৌর ব্যবস্থায় চলে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় লাফিয়ে বাড়লেও রাজস্ব আদায় তলানিতে ঠেকেছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক প্রকল্পের আওতায় ৯৬০ কোটি মার্কিন ডলারে নির্মিত সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন ধুঁকছে বিপুল লোকসানে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিলের পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই সাথে বেইজিংয়ের কাছে ইসলামাবাদের ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারে। এই পাহাড়সম দেনা পরিশোধের সময়সীমা বাড়াতে পাকিস্তান সরকার বর্তমানে চীন ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন