সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬,

কাশ্মীরে নির্বাচনি সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

কাশ্মীরে নির্বাচনি সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

কাশ্মীরে নির্বাচনি সহিংসতায় ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য-নিবন্ধিত মানবাধিকার সংগঠন জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরি (জেকেএইচআরও)। পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত জুন থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে সংগঠনটির ৪৭ পৃষ্ঠার এক বিশদ প্রতিবেদনে। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এখনো তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন। একই সাথে পুরো অঞ্চলজুড়ে বেআইনি আটক, দমনপীড়ন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাটির নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অঞ্চলটিতে অন্তত ৯০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

শুরুতে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এই ক্ষোভ পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের বিতর্কিত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের বৃহত্তর দাবিতে রূপ নেয়।

প্রতিবেদনে ২৬ বছর বয়সী যুবক ফাহাদ বারকাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুন রাতে রাওয়ালাকোটের একটি সামরিক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বোনের কাছে সর্বশেষ মুঠোফোন বার্তা পাঠানোর পর তিনি আর ঘরে ফেরেননি। তার বোনের দাবি, হাসপাতালের ফটকে পৌঁছানোর সময় রাত একটার কিছু আগে ফাহাদের গলায় গুলি লাগে। তবে কে বা কারা তাকে গুলি করেছে তা স্পষ্ট নয়। দুই মাসেরও বেশি সময় পরিবারটি বিশ্বাস করেছিল ফাহাদ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন, কিন্তু পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যম ডনের প্রকাশিত বেসামরিক নিহতের তালিকায় তার নাম দেখে সত্য উদঘাটিত হয়।

মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, ফাহাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আগে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে একটি আনুষ্ঠানিক নথিতে স্বাক্ষর করতে স্বজনদের চাপ দেওয়া হয়েছিল।

আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছিল।

তাদের অভিযোগ ছিল, বর্তমান শাসনব্যবস্থা কাশ্মীরের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রকৃত অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারছে না। বিশেষ করে আঞ্চলিক আইনসভার ৪৫টি আসনের মধ্যে ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে আসা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন পুরোপুরি বাতিলের দাবি তোলে তারা।

পাকিস্তান সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এই আসনগুলো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত এবং কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত মর্যাদার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

রাজনৈতিক বিরোধ চরম রূপ নিলে পাকিস্তান প্রশাসন কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হওয়া নিরাপত্তা অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুন পর্যন্ত সহিংসতায় পুলিশ ও সাধারণ নাগরিকসহ অন্তত ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। তবে জেএএসির দাবি, তাদের কর্মী ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক। যদিও কর্তৃপক্ষের পাল্টা অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঢুকে পড়া সশস্ত্র দুর্বৃত্তরাই মূলত সংঘাত উসকে দিয়েছিল।

সংকট চলাকালে পুরো অঞ্চলের তথ্যপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে কর্তৃপক্ষ।

গত ৫ জুন থেকে দীর্ঘ সময় অঞ্চলটিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয় এবং বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আগস্টের শেষ দিকে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট সেবা আংশিক চালু হলেও রাওয়ালাকোট ও সুদনোতি এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়।

প্রতিবেদনে নিখোঁজ ব্যক্তি ও বিনাবিচারে আটকের একাধিক ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ৩০ জুন ধিরকোট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন শওকত নওয়াজ মীর নামের এক ব্যক্তি। দীর্ঘ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তার পরিবারকে গ্রেপ্তারের কোনো আইনি কারণ বা তার বর্তমান অবস্থানের তথ্য জানানো হয়নি। তার বোন আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে হেবিয়াস করপোরেশনের আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

অন্য আরেকটি ঘটনায় গত ৫ সেপ্টেম্বর চিত্রা টোপি গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে জাবির মুমতাজ নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। পুলিশের দাবি ছিল তিনি হামলাকারী ছিলেন, তবে পরিবারের অভিযোগ মৃত্যুর আগে দুই সপ্তাহ তিনি নিখোঁজ ছিলেন এবং তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে স্বীকার না করায় পরিবারকে লাশ না দিয়ে কর্তৃপক্ষ নিজেরাই দাফন সম্পন্ন করে। একইভাবে রাওয়ালাকোটে নিজের মহিষের খামারে থাকা অবস্থায় সংঘর্ষের গুলিতে নিহত হন ২৯ বছর বয়সী নাকাশ জারদাদ, যার সাথে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

জেকেএইচআরওর পরিচালক আজর আহমেদ বলেন, কোনো নাগরিকের পরিবারকে যেন প্রিয়জনের মরদেহের সন্ধান করতে চরম দুর্ভোগে পড়তে না হয় কিংবা দাফন ও মৃত্যুর বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়। তিনি সংশ্লিষ্ট মর্গের রেকর্ড, চিকিৎসা ও আটকের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানান।

মানবাধিকার সংস্থাটির পক্ষ থেকে জুন মাস থেকে সংঘটিত প্রতিটি বেআইনি মৃত্যু ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দ্রুত, স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবারের তোলা অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব জানতে পাকিস্তান সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও কাশ্মীর পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট।