বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,
সুন্নত বনাম প্রথা

সুন্নত আমল কায়লুলা আর ভাতঘুম কি একই বিষয়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

সুন্নত আমল কায়লুলা আর ভাতঘুম কি একই বিষয়

ইসলামে কায়লুলা বা দুপুরের বিশ্রাম একটি বরকতময় ও সুন্নতি আমল। নবীজি সাহাবিদের কায়লুলা করতে উৎসাহ দিয়েছেন।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দুপুরে কায়লুলা করলে রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করা সহজ হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন যে আপনারা সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে দিনের রোজা রাখার শক্তি অর্জন করুন এবং দুপুরে কাইলুলার মাধ্যমে রাতের কিয়াম তথা তাহাজ্জুদ আদায়ের শক্তি লাভ করুন।

হাদিসে বর্ণিত এই কাইলুলার সময় ও ধরন কেমন তাও স্পষ্ট।

আমাদের দেশে দুপুরে খাওয়ার পর ভাতঘুম দেওয়ার যে প্রচলন রয়েছে অনেকে এটাকে কায়লুলা মনে করেন। কিন্তু আরবি কায়লুলা শব্দের অর্থ এবং নবী ও সাহাবিদের আমল সম্পর্কিত বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে হাদিসে বর্ণিত কায়লুলা আর আমাদের দেশের প্রচলিত ভাতঘুমের মধ্যে বেশ বড় রকম পার্থক্য রয়েছে।

আরবি কায়লুলা শব্দের অর্থ হলো দিনের মধ্যভাগে বা দুপুরের দিকে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেওয়া, তাতে ঘুম আসুক বা না আসুক।

ইমাম বুহূতি কাশশাফ আল-কিনা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কায়লুলা হলো মধ্যদিনের বিশ্রাম। আল্লামা আল-আযহারির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন যে কায়লুলা হলো দিনের মধ্যভাগে বিশ্রাম নেওয়া, যদিও এর সাথে ঘুম না থাকে।

এর সপক্ষে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি পেশ করা হয় যে সেদিন জান্নাতবাসীদের আবাসস্থল হবে উত্তম এবং কায়লুলার স্থান হবে চমৎকার। সুরা ফুরকানের চব্বিশ নম্বর আয়াতে এটি বলা হয়েছে। অর্থাৎ জান্নাতবাসীও কায়লুলা করবে, অথচ জান্নাতে ঘুম থাকবে না। এ থেকে বোঝা যায় কায়লুলার জন্য ঘুম অপরিহার্য নয়।

ফিকহবিদদের অধিকাংশের মতে, কায়লুলার সঠিক সময় হলো ঠিক দুপুরের একটু আগে, অর্থাৎ সূর্য ঢলার পূর্ববর্তী সময়।

ইমাম ইবন মুফলিহ তাঁর আল-ফুরুউ এবং আল-ইকনা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে সকালের খাবার এবং কায়লুলার প্রকৃত সময় হলো সূর্য ঢলার আগে। ইমাম আবু ইয়ালা আল-ফাররাআত-তালীয়াক আল-কাবির গ্রন্থে বলেন যে কায়লুলা এমন বিশ্রাম যা দিপ্রহরের আগে হয়।

শাফেয়ি মাজহাবের বিখ্যাত ফকিহ খতিব আশ-শাদরিবানি মুগনি আল-মুহতাজ গ্রন্থে লিখেছেন যে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের জন্য কায়লুলা করা সুন্নত, আর তা হলো সূর্য ঢলার আগের ঘুম।

হজরত সাহল ইবনু সা‍‍`দের একটি হাদিস থেকেও বোঝা যায় শুক্রবার ছাড়া অন্যান্য দিন নবীজি ও সাহাবিরা কায়লুলা করতেন জোহরের আগে। তিনি বলেন, জুমার দিন আমরা জুমার নামাজের পরই কেবল কায়লুলা ও দুপুরের খাবার খেতাম।

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে লিখেছেন যে সাধারণত কায়লুলা হতো সূর্য ঢলার আগে। এই হাদিসে সাহাবি জানিয়েছেন যে তারা জুমার দিন জুমার সালাতের প্রস্তুতি ও ব্যস্ততার কারণে কায়লুলা এবং দুপুরের খাবার জুমার সালাতের পর পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন।

ইমাম নববি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতে, ওমর ইবনুল খাত্তাবের আমল থেকেও প্রমাণিত যে কায়লুলা মূলত দিপ্রহরের পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

অবশ্য কিছু আলেম এর ব্যাপ্তি একটু বাড়িয়ে সূর্য ঢলার আগের ও পরের সময় উভয়কেই এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন আল্লামা মানাবি ফাইযুল কাদির গ্রন্থে লিখেছেন যে কায়লুলা হলো দিনের মধ্যভাগের ঘুম, তা সূর্য ঢলার সময় বা তার কাছাকাছি সময়ে হতে পারে, আগে বা পরে হতে পারে।

ওপরের আলোচনা থেকে এটি পরিষ্কার যে সুন্নত ও বরকতময় আমল যে কায়লুলা তা মূলত কিছু সময়ের ঘুমহীন বা ঘুমyielding বিশ্রাম এবং এর সঠিক সময় জোহরের আগে এবং সূর্য ঢলার আগে। কায়লুলা উদ্দেশ্য তাহাজ্জুদ আদায়ের শক্তি অর্জন করা এবং দিনের প্রথমভাগের কাজের ক্লান্তি দূর করে দিনের বাকি অংশের কাজের জন্য শক্তি অর্জন করা।

পক্ষান্তরে, আমাদের দেশে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর যে দীর্ঘ ভাতঘুমের প্রচলন রয়েছে, তা সাধারণত হয় জোহরের নামাজের পর।

এটি সাধারণত সামান্য বিশ্রাম হয় না, বরং দীর্ঘ ঘুম হয়। অনেক চিকিৎসকের মতে দুপুরে ভারি খাওয়া-দাওয়ার পর এ রকম দীর্ঘ ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ভাতঘুমের অভ্যাসকে সুন্নত আমল বলা ঠিক নয়। সুন্নত আমল মনে করে এভাবে ঘুমানোও উচিত নয়।