অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ১১:১২ এএম
শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার প্রতিমা। দশ হাতে দশটি অনন্য অস্ত্র ধারণ করে তিনি আবহমানকাল ধরে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ ও ন্যায়ের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক ব্যাখ্যায় এই অস্ত্রগুলো কেবল যুদ্ধের উপকরণ নয়, বরং শক্তি, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও শুভবোধের বহুমাত্রিক রূপক।
পুরাণ অনুসারে, মহিষাসুরের অবিরত অত্যাচারে দেবতারা যখন স্বর্গচ্যুত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখন অপশক্তিকে পরাভূত করতে আবির্ভাব ঘটে মহামায়ার। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরসহ দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে দেবী সৃষ্টি হন। পরবর্তীতে অসুর দমনের লক্ষ্যে দেবতারা প্রত্যেকে নিজেদের দিব্য অস্ত্র দেবীর হাতে তুলে দেন।
দশটি অস্ত্রের প্রতিটি মানুষের অভ্যন্তরীণ রিপু দমন ও নৈতিক জাগরণের বার্তা বহন করে।
ভগবান বিষ্ণুর দেওয়া সুদর্শন চক্র দেবীর অন্যতম প্রধান অস্ত্র। চক্র মূলত সময়ের ঘূর্ণন, সৃষ্টির অমোঘ গতিশীলতা ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার প্রতীক, যা অন্যায় বিনাশ ও সত্যের পুনরুজ্জীবন নির্দেশ করে। মহাদেবের ত্রিশূল দেবীর অলঙ্ঘনীয় শক্তির পরিচায়ক। এই অস্ত্রের তিনটি ফলা প্রকৃতির সত্ত্ব, রজ ও তম—এই ত্রিগুণের সমাহার। পুরাণে উল্লেখ রয়েছে, এই ত্রিশূল দিয়েই দেবী মহিষাসুরকে নিধন করেছিলেন।
বরুণদেবের দেওয়া শঙ্খধ্বনি ধর্মীয় আচার ও সামাজিক জীবনে পবিত্রতার বার্তা ছড়ায়। সনাতন বিশ্বাসে শঙ্খনাদ যাবতীয় অশুভ শক্তিকে দূর করে শুভ পরিবেশ গড়ে তোলে। দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া বজ্র দেবীর হাতে অপরিসীম শক্তি ও অটল দৃঢ়তার স্মারক। যেকোনো বৈরী পরিস্থিতিতে সত্যের পক্ষে অবিচল থাকার প্রেরণা জোগায় এই অস্ত্র।
ধর্মরাজ যমের দেওয়া গদা বহন করে নিয়মানুবর্তিতা, ন্যায়নীতি ও কর্তব্যপরায়ণতার চেতনা। এটি অন্যায়ের মুখে আপসহীন প্রতিরোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে বায়ুদেবের প্রদত্ত ধনুক ও তীর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদ ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। ধনুক লক্ষ্যকে স্থির রাখে এবং তীর লক্ষ্য অর্জনে অবিচল একাগ্রতা ও প্রত্যয়ের বার্তা দেয়।
দেবী দুর্গার খড়্গ বা তলোয়ারের ধার মূলত প্রজ্ঞার শক্তিকে তুলে ধরে। এটি মানুষের ভেতরকার অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি ও বিভেদের অন্ধকার দূর করে মনকে আলোকিত করে। দেবরাজ ইন্দ্রের ঐরাবত হাতির ঘণ্টার অনুকরণে স্থাপিত ঘণ্টা দেবীর আরাধনায় অনন্য। ঘণ্টার তীব্র ধ্বনি অপশক্তিকে দুর্বল করে এবং ভক্তের চিত্তকে একমুখী ও পবিত্র ধ্যানে নিবিষ্ট করে।
সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার দেওয়া পদ্মফুল সামগ্রিক অস্ত্রসজ্জার মাঝে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা সঞ্চার করে। পঙ্কিল জল থেকে প্রস্ফুটিত হয়েও পদ্ম যেমন চিরনির্মল থাকে, ঠিক তেমনি সংসারের শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিষ্কলুষ চরিত্র ও নৈতিকতা রক্ষার আহ্বান জানায় এই ফুল। নাগরাজ শেষনাগের দেওয়া নাগপাশ দেবীর অন্যতম রূপক অস্ত্র, যা ইন্দ্রিয় সংযম, কাম-ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ এবং শত্রুর কৌশলকে পরাস্ত করে আত্মনিয়ন্ত্রণে থাকার আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান করে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন