রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মানবজীবনের কোরআনিক মনজিল বা স্তরসমূহ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৫, ১১:০১ এএম

মানবজীবনের কোরআনিক মনজিল বা স্তরসমূহ

ছবি - সংগৃহীত

পবিত্র কোরআনুল কারিম মানবজীবনকে শুধু একটি ক্ষণস্থায়ী অবস্থান হিসেবে নয়, বরং এক ধারাবাহিক সফর বা যাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই সফরের প্রতিটি ধাপই হলো আল্লাহর নির্ধারিত একেকটি ‘মনজিল’ (গন্তব্য বা স্তর), যার শুরু হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে এবং যার শেষ হবে চিরস্থায়ী আবাস জান্নাত বা জাহান্নামে।

সুরা আল-আনআমের ৯৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই জীবনচক্রের এক গভীর রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, “আর তিনিই তোমাদের একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসস্থান রয়েছে। নিশ্চয়ই আমি অনুধাবনকারী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলি বিশদভাবে বিবৃত করেছি।”

এই আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে—‘মুস্তাক্বার’  এবং ‘মুস্তাওদা’ । ‘মুস্তাক্বার’ অর্থ হলো কোনো কিছুর স্থায়ী অবস্থানস্থল বা ঠিকানা। আর ‘মুস্তাওদা’ অর্থ হলো আমানত রাখা বা অস্থায়ীভাবে কোনো কিছু সংরক্ষণ করার স্থান। অর্থাৎ, আল্লাহ মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার জীবনে এই দুটি পর্বই বিদ্যমান—একটি স্থায়ী আবাস এবং অন্যটি অস্থায়ী অবস্থান।

ইসলামি স্কলার বা মুফাসসিরগণ এই দুটি শব্দের ব্যাখ্যায় মানবজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। কেউ বলেছেন, মায়ের গর্ভ হলো ‘মুস্তাওদা’ (অস্থায়ী আমানত) আর এই দুনিয়া হলো ‘মুস্তাক্বার’ (অপেক্ষাকৃত স্থায়ী)। আবার অনেকে এর চেয়েও গভীর অর্থ গ্রহণ করে বলেছেন, এই দুনিয়ার জীবনটিই হলো ‘মুস্তাওদা’ বা অস্থায়ী আমানত রাখার স্থান, আর প্রকৃত ও চিরস্থায়ী ‘মুস্তাক্বার’ হলো আখেরাত। কিছু বর্ণনায় কবরকে অস্থায়ী এবং জান্নাত বা জাহান্নামকে স্থায়ী আবাস বলা হয়েছে।

এই ব্যাখ্যাগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং সবই কোরআনের ভাষার অন্তর্ভুক্ত এবং একটি ধারাবাহিক সফরের বিভিন্ন পর্যায়কে নির্দেশ করে।কোরআনের এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষ মূলত একজন মুসাফির বা যাত্রী। তার প্রথম মনজিল পিতার পৃষ্ঠে, এরপর অস্থায়ী আমানত হিসেবে মায়ের গর্ভে, তারপর ক্ষণস্থায়ী নিবাস এই দুনিয়ায়, মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন জগৎ কবর বা বরযখে এবং সবশেষে পুনরুত্থানের মাধ্যমে তার চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী ‘মুস্তাক্বার’ বা গন্তব্যে (জান্নাত বা জাহান্নাম) সে পৌঁছে যাবে।

আল্লাহ তাআলা যেমনটি বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আরোহণ করতে থাকবে।’ (সুরা আল-ইনশিকাক: ১৯)।এই প্রতিটি মনজিল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তার কোনো অবস্থানই চূড়ান্ত নয়। সে আল্লাহর জন্যই এবং তার দিকেই তাকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। দুনিয়া আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি কেবল আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এক অস্থায়ী পরীক্ষাক্ষেত্র। আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমি অনুধাবনকারী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।”—এই গভীর উপলব্ধিই হলো প্রকৃত জ্ঞান।