জুলাই ৯, ২০২৬, ১১:৪৪ পিএম
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন মহাকাব্য রচনা করে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। রাউন্ড অফ ১৬-এর শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে প্রথমে দুই শূন্য গোলে পিছিয়ে পড়েও মাত্র ১৪ মিনিটের ঝড়ে ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। তবে আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের রাতে ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিদায় এবং দুই দলের কোচের রণকৌশলগত আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই জয় যেন স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে আরেকটি হেক্সা মিশনে নেমে ব্রাজিল ঠিক কোথায় ব্যর্থ হয়েছে।নকআউট পর্বের এই দুই ম্যাচে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে দুই দলের কোচের কৌশল ও বদলি খেলোয়াড়দের ব্যবহার।মিশরের বিপক্ষে যখন দল এক শূন্য গোলে পিছিয়ে, তখন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ৬৬ মিনিটে লেফট ব্যাক তাগলিয়াফিকোর জায়গায় অফেন্সিভ লেফট উইঙ্গার নিকো গঞ্জালেসকে এবং মাঝমাঠে রদ্রিগোর পরিবর্তে লাউতারো মার্টিনেসকে মাঠে নামান।
এই একটি মাস্টার স্ট্রোকে দলের ফরমেশন চার এক তিন দুই থেকে বদলে চার তিন তিন-এ রূপ নেয়, যা আক্রমণে তীব্রতা বাড়ানোর পাশাপাশি মিশরের কাউন্টার অ্যাটাকের পথও বন্ধ করে দেয়। এরপর ৬৭ মিনিটে মিশর দ্বিতীয় গোল করার পর ৭৩ মিনিটে মলিনার জায়গায় মন্তিয়েলকে নামানো হলে রাইট উইং দিয়ে আক্রমণের ধার আরও বাড়ে। বদলি হিসেবে নামা লাউতারো মার্টিনেজ ও গঞ্জালো মন্তিয়েলের চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই মাত্র ১৪ মিনিটে তিনটি গোল আদায় করে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।
এর ঠিক বিপরীতে নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচে কোচ কার্লো আঞ্চেলত্তির কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ম্যাচ যখন গোলশূন্য এবং বল পজিশনে ব্রাজিল পিছিয়ে, তখন ইনজুরি থেকে ফেরা নেইমারকে মাঠে নামানো হয় গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেললির পরিবর্তে। নেইমার যেহেতু রক্ষণভাগে ভূমিকা রাখবেন না, তাই ভারসাম্য আনতে উইঙ্গার রায়ানের জায়গায় মাঝমাঠে দানিলো সান্তোষকে আনা হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে ভিনিসিউস ও এনড্রিককে বক্সের আশপাশ ছেড়ে ওয়াইড এরিয়াতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়, যা ব্রাজিলের মূল আক্রমণভাগকে অকেজো করে দেয়। ফলে ৭৯ মিনিটে গোল হজম করার পর ব্রাজিলের আক্রমণে ধার তো বাড়েইনি, উল্টো মিডফিল্ড পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় নরওয়ের আর্লিং হালান্ড গোল করার সুযোগ পেয়ে যান।
দলগত সংহতি ও একতাবদ্ধ হয়ে খেলার ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে বিশাল তফাত লক্ষ্য করা গেছে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ভিনিসিউস বা মার্টিনেলিরা ব্যক্তিগত দক্ষতার কিছু ঝলক দেখালেও দল হিসেবে একটি সমন্বিত ইউনিট হিসেবে খেলতে পারেনি ব্রাজিল। পুরো ম্যাচে নরওয়ের নিয়ন্ত্রণে দুই তৃতীয়াংশ বল পজিশন থাকার মূল কারণ ছিল দলগতভাবে প্রেস করে বল কেড়ে নেওয়ার অভাব। অন্যদিকে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা প্রমাণ করেছে যে ব্যক্তির চেয়ে দলগত পারফরম্যান্স অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হুলিয়ান আলভারেজ, এনসো ফারনান্দেজ ও মন্তিয়েলরা মাঠে যতটা দেশের জন্য নিবেদিত, ততটাই তারা খেলছেন তাদের নেতা লিওনেল মেসির জন্য।
ম্যাচে পেনাল্টি মিসের পর মেসি যখন চরম হতাশায় ভুগছিলেন, তখন সতীর্থরাই নিজেদের উজার করে দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন।ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও মানসিকতার দিক থেকেও দুই দলের তারকাদের মধ্যে তফাত ছিল স্পষ্ট। পেনাল্টি মিসের পর পুরো ম্যাচে নিজেকে উজার করে দিয়ে প্রথম গোলটি করিয়েছেন এবং দ্বিতীয় গোলটি নিজে করেছেন লিওনেল মেসি। মিশরের বিপক্ষে জয়ের জন্য নিজের স্বভাবসুলভ পজিশন ছেড়ে রাইট উইং দিয়ে উপরে উঠে কাটব্যাক করার মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে।
অথচ ব্রাজিলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নেইমার মাঠে নামার পর দলের চেইন ভেঙে পড়ে এবং ভিনিসিউসকে নিচে নেমে ডিফেন্সিভ লোড নিতে হয়। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ম্যাচের শেষ মুহূর্তের মানসিকতা, যেখানে দুই এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় নেইমার প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে সময় নষ্ট করছিলেন। সেখানে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের পর ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো উদযাপন না করে সতীর্থদের ইশারা করছিলেন বল সেন্টারে বসিয়ে দ্রুত খেলা শুরু করার জন্য। এই মানসিক দৃঢ়তা ও পরিকল্পিত জয়ের ক্ষুধাই মূলত নির্ধারণ করে দিয়েছে বিদায় ও কোয়ার্টার ফাইনালের ভাগ্য।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন