শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ ও একা একা ঠেলাগাড়ি ঠেলার গল্প

শাহিন ইসলাম

জুলাই ৬, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ ও একা একা ঠেলাগাড়ি ঠেলার গল্প

ছবি - সংগৃহীত

নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচটি শেষ হলো মাঠের বুকে বুকফাটা কান্না আর একরাশ বিষাদ নিয়ে। বারবার চেষ্টা করেও লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিলকে সোনালী ট্রফি এনে দিতে না পারার আক্ষেপ বুকে নিয়েই আন্তর্জাতিক মঞ্চের সবচেয়ে বড় আসর থেকে বিদায় নিলেন এই সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবল জাদুকর। ম্যাচ শেষে মাঠের মাঝেই জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলের এই ১০ নম্বর জার্সিধারী। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে দলের সব চাপ নিজের কাঁধে বয়ে বেড়ানোর পর অবশেষে ক্লান্ত এক রাজপুত্রের প্রস্থান দেখল ফুটবল বিশ্ব।

এটাই নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের অধ্যায়টি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও একই সঙ্গে ট্র্যাজিক। অতীতে যখনই ব্রাজিল দল বড় কোনো সাফল্য পেয়েছে, তখন মাঠে রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদো, কাকা কিংবা কাফুর মতো একাধিক মহাতারকা একসঙ্গে লড়াই করেছেন। একজন ব্যর্থ হলে অন্যজন হাল ধরেছেন। কিন্তু নেইমারের যুগে দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্কার, কুতিনহো কিংবা ফ্রেডদের মতো সাধারণ মানের পারফর্মারদের পাশে নিয়ে একা একাই দলের ঠেলাগাড়ি ঠেলে গেছেন তিনি। পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার মতো কিংবা তার কাঁধের চাপ ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনো যোগ্য সঙ্গী তিনি পাননি।

সান্তোসের একাডেমি থেকে উঠে আসা সেই তরুণ ফুটবল জাদুকর ২০১১ সাল থেকে দেশের ফুটবলের একক কাণ্ডারি হয়ে উঠেছিলেন। ব্রাজিলের মতো পরাশক্তির কোটি ভক্তের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা, শত সমালোচনা আর ইনজুরির অন্তহীন বোঝা বইতে গিয়ে বারবার তাকে ছুরি-কাঁচির নিচে যেতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের পুরো শক্তি ক্ষয় করে তিনি ব্রাজিলকে এনে দিয়েছেন অলিম্পিকের কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণপদক এবং কনফেডারেশন কাপের ট্রফি। এমনকি কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে হয়েছেন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটি বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হলো না এই গ্লোবাল আইকনের।

তার বিদায়ের ম্যাচেও চরম নাটকীয়তার জন্ম হয়েছিল মাঠের বুকে। চরম চাপের মুহূর্তেও প্রতিপক্ষ গোলকিপারের চোখে চোখ রেখে পেনাল্টি থেকে নিখুঁত গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফুটবল তো আর একা জেতা যায় না। ব্রাজিলের তরুণ তুর্কি ভিনিসিউস জুনিয়র কিংবা ব্রুনোরা যখন পেনাল্টির চাপ সামলাতে ব্যর্থ হলেন, তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় ব্রাজিলের বিদায়। নেইমার যদি শুরু থেকে পুরো ম্যাচ খেলতে পারতেন, তবে হয়তো ম্যাচের গল্পটা অন্যরকম হতে পারত বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস কোনো যদি-কিন্তুর ধার ধারে না।

নেইমার আর কোনো বিশ্বকাপে হলুদ জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন না, এটিই এখন নির্মম বাস্তবতা। ফিট হয়ে মাঠে নেমে তিনি কখনো খারাপ খেলেছেন, এমন নজির তার পুরো ক্যারিয়ারে মেলা ভার। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকরাও তার পায়ের জাদু দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। একজন সত্যিকারের ফুটবল রাজপুত্র হিসেবে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, নেইমার ব্রাজিলকে যা দিয়েছেন, তার বিনিময়ে ব্রাজিল দল বা তার সতীর্থরা নেইমারকে কী দিতে পেরেছে? এক যুগের এই ট্র্যাজিক নায়কের শেষটা কি আরও কিছুটা সুন্দর হতে পারত না?