ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী মুড়িপল্লীগুলোতে ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়েছে। ইফতারে মুড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকায় দিনরাত হাতে ভাজা মুড়ি প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কয়েক শ নারী শ্রমিক। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর, রহিমানপুর ও হরিনারায়ণপুর এলাকার শতাধিক পরিবার যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত নিজ বাড়িতে মুড়ি ভাজার কাজ শেষে নারীরা নিজেরাই মাথায় করে শহরের বিভিন্ন মহল্লা ও হাট-বাজারে ফেরি করে তা বিক্রি করেন। যুগ যুগ ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রাখায় এলাকাগুলো স্থানীয়ভাবে মুড়িপল্লী নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
মোহাম্মদপুর এলাকার মুড়ি শ্রমিকরা জানান, হাতে ভাজা মুড়ি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও পরিশ্রমের। প্রথমে চাল কিনে পরিষ্কার করে লবণ মাখিয়ে রাখা হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে মাটির হাঁড়িতে বালু দিয়ে হাতে ভেজে তা মুড়িতে রূপান্তর করা হয়।
এক মণ চালের মুড়ি তৈরি করতে একজন শ্রমিকের প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জ্বালানি ও চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে অনেক পরিবার এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। কারিগরদের অভিযোগ, বাজারে মেশিনে প্রস্তুত সাদা ঝকঝকে মুড়ির ভিড়ে তাদের হাতে ভাজা লালচে মুড়ির কদর কিছুটা কমছে। মেশিনে তৈরি মুড়িতে রাসায়নিক মেশানো হয় বলে তা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
ভোক্তাদের মতে, ঠাকুরগাঁওয়ের মুড়িপল্লীর এই লাল মুড়ি সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত ও সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদা সবসময়ই থাকে। বাজারে পাওয়া সাদা ঝকঝকে মুড়িতে অনেক সময় ক্ষতিকর হাইড্রোজ ও রাসায়নিক মেশানো থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। সচেতন ভোক্তারা স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এই হাতে ভাজা লাল মুড়ির ওপরই ভরসা রাখছেন। তারা রমজান মাসে বাজার তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি ভেজাল মুড়ি বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় কারিগরদের দাবি, সরকারিভাবে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকলে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতো।
জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মাহমুদুল কবির জানান, রমজান উপলক্ষে খুব শিগগির বাজার তদারকি শুরু করা হবে এবং যেসব ব্যবসায়ী খাদ্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিক মেশাবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, রমজানে ভোক্তাদের কাছে মানসম্মত পণ্য পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি আরও আশ্বাস দেন যে, ঐতিহ্যবাহী এই মুড়ি শিল্পের প্রসার ও কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে স্থানীয় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি হাতে ভাজা মুড়ি ১০০ টাকা থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন