সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কুলিক নদীর তীরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ১০৯ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ি। এক সাধারণ সেবায়েতের ছেলে থেকে তৎকালীন মালদুয়ার স্টেটের প্রতাপশালী রাজা হয়ে ওঠার বহু স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি বর্তমানে চরম অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রতিদিন খসে পড়ছে রাজবাড়ির পলেস্তারা।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, রাজা টঙ্কনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ ছিলেন একজন মৈথিলি ব্রাহ্মণ। বর্তমান রাণীশংকৈল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার পূর্বে কাতিহার এলাকায় এক নিঃসন্তান গোয়ালা জমিদার বাস করতেন, যার মন্দিরে সেবায়েতের দায়িত্ব পালন করতেন বুদ্ধিনাথ। পরবর্তীতে ওই জমিদার ভারতের কাশীতে যাওয়ার আগে তাম্রপাতে একটি বিশেষ শর্তযুক্ত দলিল করে যান যে, তিনি ফিরে না এলে এই জমিদারির মালিক হবেন সেবায়েত বুদ্ধিনাথ। জমিদার আর ফিরে না আসায় সাধারণ এক সেবায়েতের হাতে আসে বিশাল ভূসম্পত্তি। অবশ্য এ নিয়ে ভিন্ন একটি মতও রয়েছে।

আঠারো শতকের শেষের দিকে এই এলাকা রামগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল এবং জমিদারির দায়িত্বে ছিলেন নাথপন্থী দুই চিরকুমারী বোন, যারা বড় রানী ও ছোট রানী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তারাও কাশিধামে তীর্থে যাওয়ার আগে একই শর্তে সেবায়েত বুদ্ধিনাথকে জমিদারি লিখে দেন এবং তারাও আর ফেরেননি। জমিদারি লাভের পর বুদ্ধিনাথ রাজবাড়িটির নির্মাণকাজ শুরু করলেও তা শেষ করেন তাঁর মেজো ছেলে টঙ্কনাথ। বুদ্ধিনাথের তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে রামনাথ অকালে মারা যান এবং ছোট ছেলে গৌরাঙ্গনাথ ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির।

চতুর ও দূরদর্শী টঙ্কনাথ পিতার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ জমিদারি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন এবং ব্রিটিশদের আস্থা অর্জনে মালদুয়ার স্টেট প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের স্ত্রী জয়রামা শঙ্করী দেবীর প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে পরবর্তীতে মালদুয়ার স্টেটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রাণীশংকৈল। বিত্তবৈভব ও প্রভাব প্রদর্শনে টঙ্কনাথের নানা পদক্ষেপ তৎকালীন সমাজে বেশ আলোচিত ছিল।
কথিত আছে, ব্রিটিশ বড়লাট এবং দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ রায়কে এক রাজকীয় অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে তিনি টাকার নোট পুড়িয়ে পথ আলোকিত করেছিলেন এবং উপহার হিসেবে প্রচুর স্বর্ণালংকার দিয়েছিলেন। তাঁর এমন আপ্যায়নে সন্তুষ্ট হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর তাঁকে `চৌধুরী` খেতাব দেয় এবং মহারাজা গিরিজানাথ রায় তাঁকে `রাজা` উপাধিতে ভূষিত করেন, যার পর থেকেই তিনি রাজা টঙ্কনাথ হিসেবে পরিচিতি পান।

তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার মাত্র তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট তিনি সপরিবারে সবকিছু ফেলে রাতের অন্ধকারে ভারতে চলে যান। দীর্ঘ ১০৯ বছর পার করে আসা ঐতিহ্যবাহী এই প্রাসাদটিতে বর্তমানে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন। চারপাশ আগাছায় ছেয়ে গেছে, মূল্যবান কাঠ ও লোহালক্কড় চুরি হয়ে গেছে এবং আশপাশে ছিন্নমূল মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এরপরও প্রত্নতাত্ত্বিক এই প্রাচীন নিদর্শনটি দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা সেখানে ছুটে আসছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন