রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ফের বাড়লো ডলারের দাম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৭:২০ পিএম

ফের বাড়লো ডলারের দাম

ছবি - সংগৃহীত

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান আবারও কমেছে। আমদানি দায় মেটানোর চাপ বাড়তে থাকায় ডলারের দাম উর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। আজ বুধবার, ২২ অক্টোবর, দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় পৌঁছেছে, যা গত সপ্তাহের সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৩০ পয়সার তুলনায় ৪৫ পয়সা বেশি। ডলারের এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারকেও প্রভাবিত করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার স্থিতিশীল করার পরিবর্তে রিজার্ভ পুনর্গঠনের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং বাজার থেকে ডলার ক্রয় অব্যাহত রেখেছে।ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দাম বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া। দীর্ঘ সময় ধরে ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, তা কিছুটা শিথিল হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের আমদানি বাড়ায় বাজারে ডলারের চাহিদা তীব্র হয়েছে।

এই বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পর্যাপ্ত না হওয়ায় ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। বুধবার বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, ডলারের বিক্রয়মূল্যে বড় ধরনের তারতম্য রয়েছে। বেসরকারি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে এদিন প্রতি ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা, এবং তারা ডলার ক্রয় করেছে ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা দরে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৬০ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ছিল ১২১ টাকা ৬০ পয়সা।

বেসরকারি খাতের ঢাকা ব্যাংক প্রতি ডলার বিক্রি করেছে ১২২ টাকা ৫০ পয়সায় এবং ক্রয় করেছে ১২১ টাকা ১৫ পয়সায়। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতিটি ব্যাংকেই ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানি ব্যয়কে সরাসরি বাড়িয়ে দিচ্ছে।ডলারের এই উর্ধ্বমুখী প্রবণতা আন্তঃব্যাংক বিনিময় হারকেও প্রভাবিত করেছে, যেখানে ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ডলার লেনদেন করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আজ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২২ টাকা ২৫ পয়সা, যা গতকাল মঙ্গলবার ছিল ১২২ টাকা।

অর্থাৎ, মাত্র একদিনের ব্যবধানে এখানেও ডলারের দাম ২৫ পয়সা বেড়েছে। আন্তঃব্যাংক বাজারের এই বৃদ্ধিকে মুদ্রাবাজারের অস্থিরতার একটি সুস্পষ্ট সূচক হিসেবে দেখা হয়। সাধারণত, আন্তঃব্যাংক রেটের চেয়ে খুচরা বাজারে বা ব্যাংকগুলোতে গ্রাহক পর্যায়ে ডলারের দাম কিছুটা বেশি থাকে। কিন্তু যখন এলসির চাপ বাড়ে, তখন ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক বাজারের দরের চেয়েও বেশি দামে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য হয়, যেমনটি আজ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় দেখা গেছে।

বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা বেশ লক্ষণীয়। অতীতে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতো। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই পথে না হেঁটে উল্টো বাজার থেকে ডলার কিনছে, যার মূল লক্ষ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন করা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে রিজার্ভের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কৌশল অবলম্বন করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ছয়টি ভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রতি ডলার ১২১ টাকা ৮০ পয়সা দরে মোট ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে। এই दरটি বাজারের বিক্রয়মূল্যের চেয়ে কম হলেও, ব্যাংকগুলো তাদের কাছে থাকা অতিরিক্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে (১ জুলাই) এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ডলার কেনার ফলে বাজার থেকে টাকা সরবরাহ বাড়ছে এবং ডলারের ওপর চাপ কমার বদলে তা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি জটিল ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। একদিকে রিজার্ভ বাড়ানো জরুরি, অন্যদিকে ডলারের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডলারের এই অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি আমদানিকারকদের খরচ বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। এটি দেশের মূল্যস্ফীতির পারদকে আরও উস্কে দিতে পারে, যা নিয়ে সরকার এবং সাধারণ মানুষ উভয়েই উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

একইসঙ্গে, টাকার এই অবমূল্যায়ন রপ্তানিকারক এবং প্রবাসীদের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক, কারণ তারা তাদের আয়ের বিপরীতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা পাচ্ছেন।