এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চরম অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার কারণেই বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জাতীয় সংসদে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান যে দেশে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিটি আর পরিচালনা করা হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর এই বিশেষ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা না হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। বর্তমান সময়ে মূলত এই শিশুরাই সবচেয়ে বেশি হামে আক্রান্ত হচ্ছে বলে মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের উত্থাপিত এক নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে গত ২৯ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন যে গত আট বছর ধরে দেশে হামের নিয়মিত টিকা কার্যক্রমের বাইরে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আজকের অধিবেশনে তিনি আবারও বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে সাড়ে পাঁচ বছর যাবত টিকাদান ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা এবং টিকার মজুত নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে আজ সারা দেশে এই সংকট তৈরি হয়েছে।
অধিবেশনে জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশটি উত্থাপনকালে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন দাবি করেন যে গত তিন সপ্তাহে দেশে সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১১৫ ছাড়িয়ে গেছে এবং ল্যাবে নিশ্চিত হওয়া মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। হাজার হাজার শিশু এখন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্যের সঙ্গে তার আগের দেওয়া কিছু পরিসংখ্যানে ভিন্নমত থাকলেও মূল সংকটটি যে টিকা না দেওয়ার কারণে হয়েছে তা নিশ্চিত।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে যেখানে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা আইসোলেশন প্রয়োজন সেখানে আমাদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বড় বড় হাসপাতালেও আইসোলেশন ব্যবস্থা একেবারেই ছিল না। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে আইসিইউ ও এনআইসিইউ সংকটের বিষয়টি এখন প্রকট হয়ে সামনে এসেছে।রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন দেশে সাধারণত নয় মাস বয়স থেকে হামের টিকা দেওয়া হয় কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছয় মাস বয়সীরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কেন কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে সেটি চিহ্নিত করতে রোগতত্ত্ব বিশারদদের ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি জেলা এবং ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রমে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।টিকাদান কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রী জানান যে প্রথম দিনেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। অর্থাৎ ৩০টি উপজেলায় ৭৬ হাজার শিশুর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও জানান যে আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে অবশিষ্ট এলাকাগুলোতে টিকাদান শুরু হবে। একই সাথে গত রবিবার থেকে সারা দেশে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে যাতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।হাসপাতালের অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে বর্তমানে সকল সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজশাহীতে জরুরি ভিত্তিতে আরও ২৫০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুতির পাশাপাশি আইসিডিডিআর-বি এর উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী অক্সিজেন প্রবাহ সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রান্তদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে নতুন করে হামের টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক এই খাতে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।তবে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সম্পূরক প্রশ্নে মাঠ পর্যায়ের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন যে অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকলেও সাধারণ মানুষ বাস্তবে আইসোলেশন বা আইসিইউ সুবিধা পাচ্ছে না।
এমনকি গত অর্থবছরেও স্বাস্থ্য খাতের ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ করা সম্ভব হয়নি যা অব্যয়িত থেকে গেছে। এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান যে করোনাকালীন সময়ের অব্যয়িত ৬০৪ কোটি টাকা ইউনিসেফকে প্রদান করা হয়েছে যার মাধ্যমে অতিরিক্ত হামের টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে টিকার সংকট এড়াতে মন্ত্রণালয় এখন অনেক বেশি সতর্ক এবং মাঠ পর্যায়ের তদারকি বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি সংসদকে নিশ্চিত করেন।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন