বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সমন্বিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে

রাকিবুল হাসান মুন্না

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সমন্বিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে

ছবি: Ai

দেশের ছয়টি জেলায় নতুন করে প্রাণিবাহিত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক ব্যাধি অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর অনুসন্ধান এবং মাঠপর্যায়ের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মাত্র তেইশ দিনে সাতচল্লিশ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের পীরগাছা ও মিঠাপুকুর, মেহেরপুরের গাংনী এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ব্যক্তি এ রোগে সংক্রমিত হয়েছেন। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের স্পোর সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত এই ব্যাধি মূলত তৃণভোজী গবাদিপশু থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। 

বিগত কয়েক দশক ধরে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গবাদিপশুসমৃদ্ধ জনপদগুলোতে এই মারণব্যাধির বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য ও কৃষি অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। অসুস্থ গবাদিপশু জবাই ও মাংস বিক্রিই এই সংক্রমণের প্রধান কারণ। আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক উপসর্গ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সংক্রমণের সিংহভাগই চর্মজনিত অ্যানথ্রাক্স। সংক্রামিত পশুর কাঁচা মাংস কাটাছেঁড়া, চামড়া ছাড়ানো কিংবা রুগ্ন পশুর সংস্পর্শে আসার দুই থেকে তিন দিনের মাথায় আক্রান্ত ব্যক্তির হাত, মুখসহ শরীরের উন্মুক্ত ত্বকে চুলকানিযুক্ত লাল ফোসকা তৈরি হয়। 

অল্প সময়ের মধ্যেই তা চুলকানিহীন লাল ক্ষত থেকে একটি স্পষ্ট কালো রঙের এস্কার বা শক্ত ক্ষতে রূপান্তরিত হয় এবং সাথে প্রচণ্ড জ্বর ও শরীরব্যথা দেখা দেয়। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, খামারিদের মূল্যবান গরু বা ছাগল মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে আর্থিক ক্ষতি এড়াতে তারা দ্রুত কম দামে তা স্থানীয় মাংস ব্যবসায়ী ও প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করে দেন। অসচেতন মানুষ সেই মাংস কাটাকাটি করতে গিয়ে নিজেদের ত্বকে থাকা সামান্য কাটাছেঁড়ার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসেন।

মাটিতে দীর্ঘকাল টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতাই এই ব্যাকটেরিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিসের স্পোর ভূগর্ভস্থ মাটিতে কয়েক দশক পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। বর্ষাকালে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির তলদেশে সুপ্ত থাকা এসব স্পোর ভূ-পৃষ্ঠে ভেসে উঠে চারণভূমির কাঁচা ঘাস ও নিচু জলাশয়ের কাদা-পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে চরে বেড়ানোর সময় গবাদিপশু সংক্রামিত ঘাস বা কচুরিপানা খাওয়ার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়। আরও সংকট তৈরি হয় যখন আক্রান্ত পশুর মৃতদেহ খোলা উঠানে জবাই করা হয় কিংবা উন্মুক্ত ডোবা, নদী-নালায় ফেলে রাখা হয়। 

বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে রক্তের ব্যাকটেরিয়া বায়ুবাহিত প্রতিরোধী স্পোরে রূপান্তরিত হয়ে আশপাশের সামগ্রিক পরিবেশকে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য মারাত্মকভাবে দূষিত করে তোলে। নিয়মিত গণটিকা প্রদান এই সংক্রমণচক্র ভাঙার মূল হাতিয়ার হলেও টিকার অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও কর্মীর অভাবে দেশের অর্ধেকের বেশি পশু এখনও টিকার সুবিধার বাইরে রয়েছে। মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের পূর্বানুমতি ছাড়া পশু জবাই নিষিদ্ধ হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এর দৃশ্যমান কোনো তদারকি নেই। তদুপরি খামারিদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পশুবিমা বা দুর্যোগকালীন ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা না থাকায় তারা গোপনে অসুস্থ পশু বিক্রি করতে বাধ্য হন। 

এদিকে রোগ ছড়ানোর আতঙ্কে স্থানীয় বাজারে মাংস বিক্রি অস্বাভাবিক হারে কমে গিয়ে সাধারণ খামারি ও পশু ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই ধারাবাহিক সংকট নিরসনে মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং পরিবেশ খাতকে এক ছাতার নিচে এনে কার্যকর ওয়ান হেলথ কৌশল বাস্তবায়ন জরুরি। বর্ষা শুরুর পূর্বেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শতভাগ গবাদিপশুকে বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে টিকার আওতায় আনা এবং চিকিৎসকের সনদ ছাড়া খোলাবাজারে মাংস বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। 

একই সঙ্গে প্রাণী সংক্রামক ব্যাধি আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করে মৃত পশুর দেহ মাটিতে অন্তত ছয় ফুট গভীরে চুন ছিটিয়ে সমাহিত করতে হবে। প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা চালু করা গেলে অসুস্থ পশু জবাইয়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। সেই সাথে আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণ পর্যায়ে লিফলেট প্রচার, পশুর মৃত্যু হলে ভেটেরিনারি সার্জনকে অবহিত করা এবং কালো ক্ষতের উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।