নভেম্বর ১০, ২০২৫, ০৩:৫৯ পিএম
ইন্টারনেট অবকাঠামো যে কেবল ডিজিটাল অগ্রযাত্রার মাধ্যম তা নয়—এর ওপরই একটি দেশের জাতীয় নেটওয়ার্কের গতি-প্রকৃতি, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভর করে। দেশের এমন সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠলেও প্রেক্ষাপট খুব একটা বদলায়নি।
সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ঘুরেফিরে সেই পুরোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাইবার সিস্টেম গিলে খাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, ব্যান্ডউইথ সরবরাহে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছে।সম্প্রতি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিপিএলসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি থেকে এ বিষয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।
বিজ্ঞপ্তি ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে—আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সরবরাহের ক্ষেত্রে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ সাবমেরিন কেবল সংযোগের চেষ্টা চলছে বেশ জোরেশোরে।১৮ অক্টোবরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিএসসিপিএলসি জানায়, তাদের মাধ্যমে ট্রাস্টেড ও আন্তর্জাতিক মানের কানেকটিভিটির জন্য পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথ সরবরাহের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, বেসরকারি উদ্যোগে ‘আনট্রাস্টেড’ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাবমেরিন কেবল সংযোগের চেষ্টা চলছে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সরবরাহকৃত ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের জন্য জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।এর আগে বিএসসিপিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন তাঁর ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন যে, ২০২২ সালে তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান “অন্যায্য প্রভাব” খাটিয়ে সাবমেরিন কেবল লাইসেন্স পেয়েছে।
তিনি জানান, অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স পাইয়ে দিতে একাধিকবার লাইসেন্সিং গাইডলাইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার কথা থাকলেও, নিয়ম পাল্টে তিন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। এখন তারা লাইসেন্স নিয়েও একীভূত হয়ে কনসোর্টিয়াম গঠন করে একটি মাত্র বিদেশি কেবলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে।
বিএসসিপিএলসি’র এমডি’র দাবি, এই সংযোগটি হতে যাচ্ছে পুরোনো ও অনির্ভরযোগ্য ‘Sigma’ বা Singapore–Myanmar সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে, যা চীনা প্রতিষ্ঠান Huawei Marine Network (HMN) নির্মাণ করেছে। এই কেবলের প্রায় ৯০ শতাংশ অবস্থান মিয়ানমারের অগভীর জলসীমায়। ফলে, কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামতের জন্য মিয়ানমার সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। উল্লেখ্য, HMN যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া কর্তৃক “Untrusted Vendor” হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে বাংলাদেশও একটি অনির্ভরযোগ্য সাবমেরিন কেবল সিস্টেমের অংশ হয়ে পড়বে।
আসলাম হোসেন সতর্ক করে বলেন, এই সংযোগ যুক্ত হলে Google, Meta, Amazon-এর মতো হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার বাংলাদেশে নিরাপদ নেটওয়ার্ক স্থাপনে নিরুৎসাহিত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ক্লাউড সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, দেশে সাইবার হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধির সময়ে অনির্ভরযোগ্য সংযোগে যুক্ত হওয়া মানে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে একযোগে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
এদিকে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিন প্রতিষ্ঠান—সামিট কমিউনিকেশনস, মেটাকোর ও সি-ডিনেট—ইতিমধ্যেই তাদের প্রচার ও তৎপরতা জোরদার করেছে। তারা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও প্রভাব খাটিয়ে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী জানান, কেবল লেইংয়ের জন্য এখনো তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, লাইসেন্স প্রক্রিয়া ছাড়াও বেসরকারি এই তিন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন আছে, যাদের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাবমেরিন কেবল কেবল ইন্টারনেট সরবরাহকারী একটি পাইপ নয়, এটি দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই ধরনের বিদেশি নির্ভরতা বা অনির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া দেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন