সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে রাশিয়ার পক্ষে লড়ছে বাংলাদেশি তরুণরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্চ ৫, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে রাশিয়ার পক্ষে লড়ছে বাংলাদেশি তরুণরা

যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সম্মুখ সারিতে লড়ছেন অনেক বাংলাদেশি তরুণ। ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর দালালের প্রলোভনে পড়ে তারা জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশায়। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা এবং বর্তমানে সেখানে অবস্থানরতদের ভাষ্যমতে, সম্মুখ সমরে প্রতিটি মুহূর্ত কাটে মৃত্যুর আতঙ্কে। চারদিকে কেবল লাশের স্তূপ, ল্যান্ডমাইন আর ড্রোন হামলার বিভীষিকা। 

মুন্সিগঞ্জের মোহন মিয়াঁজি নামে এক তরুণ সম্প্রতি রাশিয়ার সৈন্যশিবির থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ফ্রন্টলাইনে থাকার অর্থ হলো প্রতি সেকেন্ডে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। এই যুদ্ধে তার বন্ধু আশিকুরসহ অনেক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, আবার কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ বাংলাদেশি তরুণ সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভেবে রাশিয়া যাননি। তারা মূলত চীনা বা রুশ বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে অথবা স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। 

মোহন মিয়াঁজি নিজেও একটি তেল-গ্যাস কোম্পানিতে কাজ করতে রাশিয়া গিয়েছিলেন। সেখানে সোহেল নামে এক সাবেক সহকর্মীর প্ররোচনায় এবং নিরাপদ কাজের আশায় রুশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখান। কিন্তু ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পর তাদের ইলেকট্রনিক্স বা সাধারণ কাজের পরিবর্তে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে পাঠানো হয়। দালালেরা ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করেছিল যে বিদেশিদের সম্মুখ যুদ্ধে পাঠানো হয় না, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি বড় ধরনের প্রতারণা।

বাংলাদেশি নাগরিকদের এই যুদ্ধে জড়ানোর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের সাথে ভারতীয় নাগরিক এবং কয়েকজন বাংলাদেশির জড়িত থাকার তথ্য সামনে এসেছে। চক্রটি ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট জব্দ করে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিনামায় জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। যেহেতু প্রবাসীরা রুশ ভাষা জানেন না, তাই তারা বুঝতে পারেন না যে এটি মূলত এক বছরের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণের চুক্তিপত্র। 

এমনকি রুশ সরকার যুদ্ধে যোগদানের জন্য যে বিশাল অংকের অর্থ দেয়, তার বড় একটি অংশ দালালরা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া কোনো যোদ্ধা মারা গেলে তার পরিবার যে ক্ষতিপূরণ পাবে, সেটিও যেন দালালরা পায় সেজন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে বহু বাংলাদেশি তরুণ রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন ফ্রন্টলাইনে লড়ছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই কোনো খোঁজ পাচ্ছে না দেশে থাকা পরিবার। রাজবাড়ির নজরুল ইসলাম নামে এক সাবেক সেনা সদস্য যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন বলে তার পরিবার নিশ্চিত করেছে। একইভাবে ফার্নিচার কোম্পানিতে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে অনেককে। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অনেক নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অস্পষ্ট। স্বজনদের আহাজারি আর অনিশ্চয়তায় কাটছে দিন। দালালদের এই আন্তর্জাতিক চক্রটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাচার করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি রোধে কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা