সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে চীনের মধ্যস্থতা: কতটা সফল হবে?

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে চীনের মধ্যস্থতা: কতটা সফল হবে?

শান্তি ফেরাতে বেইজিংয়ের তৎপরতা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করার পর যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে, ঠিক তখনই শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে ময়দানে নেমেছে চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে যখন ইরানে সামরিক অভিযান দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তখন চীন এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। 

তবে এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কী হবে কিংবা কীভাবে স্থিতিশীলতা আসবে তা নিয়ে এখনও বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।এই শান্তি প্রক্রিয়ায় চীনের সাথে যোগ দিয়েছে পাকিস্তান। 

অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান এখন ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে এক অপ্রত্যাশিত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেইজিং এবং ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা যৌথভাবে একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছেন যার মূল লক্ষ্য হলো দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং অবরুদ্ধ হয়ে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া। 

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনকে এই মধ্যস্থতায় রাজি করানোর একটি চেষ্টা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।চীনের এই উদ্যোগের পেছনে বড় ধরনের কৌশলগত কারণ রয়েছে। বেইজিং আগামী মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনার আগে নিজেকে ওয়াশিংটনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরছে। লানঝাউ ইউনিভার্সিটির আফগানিস্তান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও মনে করেন যে চীনের এই সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

তার মতে চীন নৈতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে যাতে ইসলামাবাদ এই সংকটে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে নীরব থাকা বেইজিংয়ের হঠাৎ এমন সক্রিয় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তাদের নিজস্ব অর্থনীতি। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের কাছে কয়েক মাসের তেলের মজুদ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তাদের শিল্প খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে। 

বিশেষ করে শি জিনপিং যখন দেশের ধুঁকতে থাকা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অস্থিরতা তার জন্য বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের কারণে যদি অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, তবে চীনের ফ্যাক্টরি এবং রপ্তানিকারকদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।প্লাস্টিক থেকে শুরু করে খেলনা, সিন্থেটিক কাপড়, ইলেকট্রনিক্স এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ—সবকিছুর উৎপাদন খরচ সরাসরি তেলের দামের সাথে জড়িত। চীনের শিল্পাঞ্চল যা বিশ্বজুড়ে পণ্যের যোগান দেয়, তারা ইতিমধ্যে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। 

এর বাইরে গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে চীনের রপ্তানি বিশ্ব বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বেড়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রকল্পে বেইজিং এই অঞ্চলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাকে চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনের বিশাল সব প্রকল্প চলমান রয়েছে।

নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় চীন এই অঞ্চলের প্রায় সব পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। সৌদি আরবের মতো মার্কিন মিত্র হোক কিংবা ইরানের মতো কট্টর শত্রু—সবার সাথেই বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক লেনদেন রয়েছে। চীনের মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে ইরান থেকে। এর আগেও ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক তিক্ততা নিরসনে চীন সফল মধ্যস্থতা করেছিল। এরপর ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনের ১৪টি উপদলের নেতাদের বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনে সহায়তা করার চেষ্টাও তারা করেছে।

তবে চীনের এই শান্তি প্রচেষ্টার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বেইজিংয়ের অংশীদারিত্ব মূলত অর্থনৈতিক এবং এতে কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা গ্যারান্টি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে যখন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে চীনের একমাত্র লজিস্টিক হাব রয়েছে পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে। এমনকি ২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ও চীন অনেকটা পার্শ্বচরিত্রে ছিল। এছাড়া রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা, হংকংয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং তাইওয়ান নিয়ে বারবার হুমকির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে চীনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।

 বেইজিংয়ের এই ৫ দফা শান্তি পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে শি জিনপিংয়ের এই উদ্যোগ তাকে আবারও একজন নিরপেক্ষ বিশ্বনেতা হিসেবে জাহির করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ঠিক বিপরীত মেরুর অবস্থান। দিনশেষে এই পরিকল্পনা কাজ করবে কি না তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। একা চীন বা পাকিস্তানের পক্ষে এই ভয়াবহ যুদ্ধের সমাপ্তি টানা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা।