বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬,

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তীব্র সংকট রাস্তায় লাখো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তীব্র সংকট রাস্তায় লাখো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক

ছবি: সংগৃহীত

স্কুলগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা, প্রকট শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবন এবং দীর্ঘ কর্মদিবসের প্রতিবাদে ফ্রান্সে আড়াই লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক একযোগে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। মঙ্গলবার দেশটির রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ মুহুর্মুহু টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ চালায়। সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনকালে আহত হয়েছেন ৪৩ জন পুলিশ সদস্য।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশজুড়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ সরাসরি এই বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসের রাজপথেই সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। তবে বিক্ষোভের আয়োজক প্ল্যাটফর্মগুলোর দাবি, দেশব্যাপী অংশগ্রহণকারীর প্রকৃত সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার। মার্সেই, নঁত ও লিওঁসহ বড় শহরগুলোতে অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও প্যারিসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত রূপ নেয়।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই সহিংস বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭১৫ জন পুলিশ সদস্যও। সার্বিক পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি বলে আখ্যায়িত করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষার্থীদের প্রধান অভিযোগ, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন চরমভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের দেয়াল ও ছাদে বিপজ্জনক ফাটল, ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, ভাঙাচোরা শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিলের চরম ঘাটতি রয়েছে। অনেক স্কুলে নিয়মিত শিক্ষকের তীব্র সংকট চলছে। অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ পাঠদান নিয়মিতভাবে বাদ পড়ছে।

এর পাশাপাশি স্কুলের দীর্ঘ সময়সূচি নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে অনেক স্কুলে সকাল ৮টা থেকে একটানা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ক্লাস ও কার্যক্রম চলে। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে এই দীর্ঘ সময়সূচি পুনর্বিবেচনা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানো এবং অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় দ্রুততম সময়ে বিকল্প শিক্ষক পদায়নের সুনির্দিষ্ট দাবি তুলেছেন।

দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রায় তিন হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ ছিল অথবা সেদিনের মতো পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, আন্দোলনকারীদের দ্বারা অবরুদ্ধ কিংবা বন্ধ থাকা স্কুলের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৮০০। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে বেশ কিছু এলাকায় অনলাইনে বিকল্প ক্লাস নেওয়া হয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতার মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একাংশ বিভিন্ন স্কুলের ফটকের সামনে ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন, যাত্রীবাহী বাসস্টপ ভাঙচুর করেন এবং পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়েন। বিপরীতে পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভ দমনে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিভিন্ন আধুনিক মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছেন।

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৪টি স্কুলে অগ্নিসংযোগ কিংবা ভাঙচুরের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে ছয় হাজার ১০০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করেছে, যাদের সিংহভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ইতিমধ্যে এক হাজার ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা পরিচালনা করছে বিচার বিভাগ। বিক্ষোভ দমনে ফরাসি পুলিশের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত ও অসংলগ্ন বলপ্রয়োগের জোরালো অভিযোগও উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ অনতিবিলম্বে বন্ধের তীব্র আহ্বান জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে ১০টি পৃথক অভ্যন্তরীণ তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

পুলিশি বলপ্রয়োগে বেশ কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর মারাত্মকভাবে পঙ্গুত্ব ও ক্ষতের শিকার হয়েছে। গত সোমবার উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাতের কব্জি উড়ে যায়। এর আগে তুর শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়েছে। এছাড়া প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সংঘর্ষের মধ্যে এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের দাঁত ও চোয়াল গুরুতরভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। এসব মর্মান্তিক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাঙ্গা মোকাবিলার অস্ত্র ব্যবহারের নীতি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।

তীব্র বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধানের জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। এর আওতায় অনুপস্থিত শিক্ষকদের শূন্যস্থানে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক পদায়ন, স্কুলের দীর্ঘ সময়সীমা পুনর্মূল্যায়ন এবং জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও শিক্ষকদের ওপর আক্রমণের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার গভীর রাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়ে এক জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকা অবস্থায় এই ছাত্র অসন্তোষ ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। চরম অর্থনৈতিক মন্দা, বড় আকারের বাজেট ঘাটতি ও জাতীয় ঋণের বোঝায় জর্জরিত দেশটির সরকারকে এখন একই সঙ্গে রাজপথের ক্ষোভ ও প্রশাসনিক সংস্কার মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

চলমান এই ছাত্র বিক্ষোভে ফ্রান্সের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সমর্থন লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, কট্টর বামপন্থী রাজনৈতিক দল লা ফ্রান্স ইনসুমিজ এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উসকে দিচ্ছে। তবে দলটির শীর্ষ নেতা ও আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ সরকারের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং তাদের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।