অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্ন মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকটের প্রতিবাদে ইউরোপের চার দেশে রাস্তায় নেমেছেন লাখো মানুষ। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে স্থানীয় সময় শনিবার পৃথক বিক্ষোভ ও উত্তাল সমাবেশে নজিরবিহীন জনসমাগম ঘটে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, দফায় দফায় লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ছুড়েছে। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলোর ওপর নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সে এই বিক্ষোভ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উত্তাল রূপ নেয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নাগরিক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এই বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে উগ্র প্রতিবাদকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন শহরের সরকারি ভবন, অভিজাত বিপণিবিতান ও সুপারশপে হামলা চালায়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয় পুলিশের গাড়ি ও কর্তব্যরত সদস্যরা।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, শনিবারের ঘটনায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫০ জন পুলিশ সদস্য। প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেখতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি না হওয়াটা অলৌকিক ঘটনা।
প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গে বহু দোকানে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানান, রাজধানীর পুরো সড়কই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিমোজ শহরে মুখোশধারীদের দেওয়া আগুনে প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো নগর ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মার্সেই ও লিলের নগর ভবনেও হামলা হয়েছে, আর লিওঁ শহরে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পর্যটন কার্যালয়। এই সহিংসতার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই তাণ্ডবের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
একই দিনে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে বেলজিয়াম ও পর্তুগালেও।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রতিবাদে বেশ কিছুদিন ধরেই শিক্ষার্থীরা মাঠে ছিলেন। শনিবার পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়েজেও বিক্ষোভকারীদের হটাতে জলকামান ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বল্প মজুরি ও তীব্র আবাসন সংকটের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার মানুষ। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, আর নতুন ভাড়ার চুক্তিগুলোতেও একই ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম মন্তব্য করেন, রাজপথে স্লোগান দিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বদলানো যাবে না। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন নেতারা সাধারণ মানুষের বাস্তব দুর্দশা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
ইতালির মিলান শহরে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে আয়োজিত মিছিলটি শুরুতে শান্ত থাকলেও পরে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারী ব্যক্তিরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ভারী পাথর ও রাস্তার পাথরের টুকরো ছুড়তে শুরু করে। টেবিল দিয়ে তৈরি করা সড়কের ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। স্থানীয় বার্তা সংস্থার তথ্যমতে, সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কসহ প্রায় ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিক্ষোভ করা নাগরিক অধিকার হলেও শহরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই অধিকার নয়। মিলানের মেয়র জিউসেপ্পে সালা জানান, বিক্ষোভের কারণ বোধগম্য হলেও পুলিশের ওপর আঘাত ও শহরের ক্ষতি গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া বোলোনিয়া শহরেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক অধ্যাপক আলবের্তো আলেমান্নো মনে করছেন, ফ্রান্স বর্তমানে এই ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হলেও অসন্তোষ দ্রুত অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়াতেও প্রাথমিক আন্দোলনের লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে, যা আগামী সপ্তাহে আরও জোরদার হতে পারে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিটি দেশে আলাদা প্রেক্ষাপট থাকলেও শিক্ষায় বরাদ্দের ঘাটতি, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ইউরোপের তরুণ ও সাধারণ মানুষকে একই সূত্রে গেঁথেছে। আগামী ১২ মাসের মধ্যে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন