সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালনকালে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে সংঘটিত অন্তত ২২টি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব অভিযান চালানো হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তৎকালীন সময়ে ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি’ অবগত ছিলেন বলেও জিয়াউল আহসান উল্লেখ করেছিলেন বলে জানান এই সাক্ষী। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই বিচারিক সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। তিনি জানান, ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন ২৮তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে মেজর পদে থাকা অবস্থায় র্যাবে বদলি হয়ে প্রথমে র্যাব-২-এর ধানমন্ডি কোম্পানি কমান্ডার এবং অক্টোবরে র্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। সে সময় র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান।
জবানবন্দিতে প্রথম ঘটনার বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের জানুয়ারির এক রাতে জিয়াউল আহসান মাইক্রোবাস নিয়ে র্যাব-৮ সদর দপ্তরে পৌঁছান এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে বের হন। তাদের গাড়িটি পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছালে আগে থেকে প্রস্তুত থাকা একটি ট্রলারে ওঠেন। সেখানে হাত বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরা এক ব্যক্তিকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে রাখা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা চলার পর জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ওই ব্যক্তিকে বের করে আনে গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা। এরপর তার গলা ও পায়ে দুটি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মাথায় বালিশ ঠেকিয়ে গুলি করা হয়।
পেট কেটে নিশ্চিত হওয়ার পর লাশটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে দুশ্চিন্তা না করার পরামর্শ দিয়ে জিয়াউল বলেন যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। দ্বিতীয় ঘটনার বর্ণনায় সাব্বির জানান, ২০১০ সালের মে মাসে একই কায়দায় চরদুয়ানী ঘাট থেকে ট্রলারে চারজন বন্দিকে তুলে নেওয়া হয়। দেড় ঘণ্টা ট্রলার চালানোর পর একে একে চারজনকেই একই প্রক্রিয়ায় গুলি ও পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার কয়েক দিন পর শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে ভেসে ওঠা একটি মরদেহের ডিএনএ পরীক্ষায় জানা যায়, নিহত ব্যক্তি ছিলেন বিডিআরের সাবেক সদস্য নজরুল ইসলাম।
অভিযানের সাথে যুক্ত আলকাছ মাঝি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও উঠে আসে সাক্ষ্যে। ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান ফোন করে আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান এবং অভিযোগ করেন যে ওই মাঝি বিভিন্ন অভিযানের তথ্য বাজারে প্রকাশ করে দিচ্ছেন। জিয়াউল তাকে হত্যার নির্দেশ দিলে সাব্বির অসুস্থতার কথা বলে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর কয়েক দিন পর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফোনে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে ডেকে নেওয়ার পর থেকে আলকাছ মাঝির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সুন্দরবন এলাকায় তথাকথিত তিনটি বন্দুকযুদ্ধের বিবরণও জবানবন্দিতে বিশদভাবে তুলে ধরেন এই সাক্ষী। ২০১১ সালের নভেম্বরে নিশানখালী খাল সংলগ্ন বনে রাজু বাহিনীর গোপন আস্তানায় কথিত অভিযানের আগের রাতেই গোয়েন্দা দলের একটি দল সেখানে পৌঁছে যায়। পরদিন ভোরে অভিযান শুরুর মুহূর্তে বনের ভেতর থেকে হুইসেলের সংকেত পেয়ে আভিযানিক দলকে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। গুলিবর্ষণ শেষে ঘটনাস্থলে দুটি মরদেহ উদ্ধারের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে মামলার প্রক্রিয়াকালে ছয়টি মরদেহ পাওয়ার কথা জানানো হয়।
পরবর্তী অভিযানটি পরিচালিত হয় ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কটকা ফরেস্ট স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে। সেখানে ট্রলারের খোল থেকে চার ব্যক্তিকে একইভাবে হত্যা করে পানিতে ফেলা হয় এবং পঞ্চম ব্যক্তিকে বনের ভেতর নিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের মার্চে সুন্দরবনের মরা ভোলা এলাকায় ত্রিমাত্রিক অভিযানে প্রায় আধা ঘণ্টা গুলিবর্ষণের পর অস্ত্র ও পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার দেখানো হয়। এসব অভিযান সাজানো ছিল বলে আদালতে দাবি করেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি অভিযানের আগে গোয়েন্দা দলের সদস্যরা চলে যেতেন এবং দস্যুদের সাধারণ বন্দুকের পরিবর্তে ভেতর থেকে হুইসেল ও অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দ পাওয়া যেত। এ ছাড়া অভিযান চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা হেলমেট ছাড়া সাধারণ পোশাকে ঘটনাস্থলে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। তিনি আরও জানান, র্যাবে দায়িত্ব পালনকালে তার জানামতে বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে অন্তত ১৫ থেকে ২০ বার এই ধরনের গোপন অভিযান চালানো হয়েছিল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন