ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদি সময়সীমা। বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন মেরুকরণের ফলে ফারাক্কা ও গঙ্গা ইস্যুটি এখন কেবল একটি পানিসম্পদ বণ্টন চুক্তি নয়, বরং সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের লোকসভায় দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানিয়েছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গেই এই চুক্তির পুনর্নবায়ন বা পুনঃআলোচনা শুরু হবে। তার এই বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজান ও ভাটির দেশ হিসেবে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজকে একটি রাজনৈতিক ‘লিভারেজ’ বা চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবগৌড়া এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনার মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনের একটি সুনির্দিষ্ট স্তরীয় কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারকে তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ট্রানজিট, বিদ্যুৎ এবং বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোকে ‘ইস্যু লিংকেজ’ হিসেবে ব্যবহার করে দরকষাকষিতে বসতে হবে। ২০২৬-এর ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কোনো সম্মানজনক চুক্তি না হলে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ঐতিহাসিকভাবে ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সংকটের কারণ।
১৯৭৫ সালে চালু হওয়া এই ব্যারাজের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া, কৃষি বিপর্যয় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দেয়। যদিও ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক মাইলফলক হিসেবে পরিচিত, তবুও শুষ্ক মৌসুমে নির্ধারিত পানিপ্রবাহ না পাওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বরাবরই ছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দিল্লি হয়তো এই চুক্তিটি আর ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি না করে ১০ থেকে ১৫ বছরের একটি কাঠামোতে নিয়ে আসতে চায়, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী পানিনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
এই চুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে অতীতে তিস্তা চুক্তি থমকে গিয়েছিল। গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকারের মতামত ছাড়া কেন্দ্র এগিয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালের জলপথ কনভেনশনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা গঙ্গা পানি ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত। শেষ পর্যন্ত গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দিল্লি ও ঢাকার পারস্পরিক আস্থা এবং আঞ্চলিক স্বার্থের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন