অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১১:১১ এএম
জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখাকে বর্তমান সময়ের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে আসাম সংকট ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
সীমান্তের ভূরাজনীতি এখন ঢাকার নীতিগত পরীক্ষার মুখোমুখি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১২০ বছর আগে ঢাকা থেকে বাঙালি মুসলমানের যে ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, ব্রহ্মপুত্রের চর থেকে শিলচরের রেলস্টেশন পেরিয়ে তা আজও অসমাপ্ত রয়েছে। সেই ধারাবাহিক লড়াই ও স্বজাতির ঐতিহ্যকে ধারণ করে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
আসামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি লেখেন, প্রায় এক শতাব্দী আগে আসামের নগাঁও অঞ্চলে বাঙালি মুসলমান কৃষকদের বসবাসের পরিসর সীমিত করতে যে কুখ্যাত লাইন প্রথা টানা হয়েছিল, শতবর্ষ পেরিয়ে আজও সেই নগাঁওতেই বুলডোজার চালানো হচ্ছে। শাসক ও ভাষা বদলে গেলেও নিশানার পরিবর্তন হয়নি। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মাত্র দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের এক হাজার ১০০-রও বেশি বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভেঙে ফেলা হয়েছে অন্তত ১০টি মসজিদ। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের ব্যবধানে অন্তত ৩৩টি অভিযানের মাধ্যমে ২২ হাজারেরও বেশি পরিবারকে গৃহহীন করার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন সরকারি বুলডোজার বারবার একই সম্প্রদায়ের দোরগোড়ায় গিয়ে থামছে।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করে নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, অতীতে আসামের রাজনৈতিক বিরোধ অসমীয়া বনাম বাঙালির জাতিগত সংঘাত হলেও বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সেই রাজনীতিকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কাঠামোয় রূপান্তর করেছে। যার মূল নিশানা বানানো হয়েছে বাংলাভাষী মুসলমানদের।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উচ্ছেদের এই নির্দিষ্ট ধারায় হাজার হাজার মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য নতুন আধার কার্ড প্রদান কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়া হলেও বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য কোনো বিকল্প রাখা হয়নি। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) থেকে ১৯ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) মাধ্যমে অমুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার ফলে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাকের অবৈধ অপচেষ্টা। তিনি বলেন, বিচারিক ট্রাইব্যুনালকে পাশ কাটিয়ে জেলা প্রশাসকদের হাতে বহিষ্কারের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে এবং বিজিবির টহল ফাঁকা থাকার সুযোগ নিয়ে মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লেখেন, ১৮৭৪ সালে করিমগঞ্জসহ সিলেটকে মূল বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক গণভোটে শতকরা ৫৭ ভাগ ভোটে সিলেট তৎকালীন পূর্ববঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জসহ কিছু অংশ আসামে থেকে যায়। এ কারণে সিলেটের মানুষের কাছে আসাম কোনো বিদেশি ভূখণ্ড নয়, বরং রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের পরিচয় বহন করে। এনআরসির বড় আঘাতটি বরাক উপত্যকার যে তিনটি জেলায় পড়েছে, তার অন্যতম করিমগঞ্জ।
ভাষার অধিকার আদায়ের ইতিহাস টেনে তিনি বলেন, বাংলা ভাষা আন্দোলন কেবল ঢাকার রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে পুলিশের গুলিতে ১১ জন বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে ১৯৭২ ও ১৯৮৬ সালেও রক্ত ঝরেছে। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বরাক উপত্যকায় বাংলা দাপ্তরিক স্বীকৃতি পায়। শিলচরে আত্মাহুতি দেওয়া ভাষা শহীদদের একটি বড় অংশ বাঙালি হিন্দু পরিবারের সন্তান হওয়ায় প্রমাণিত হয় যে ভাষার প্রশ্নে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিল। ফলে বরাকের এই ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যও দুই সম্প্রদায়ের অবিভাজ্য উত্তরাধিকার।
অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল জানিয়ে নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেন, আসামে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সেখানকার বাঙালি মুসলমানেরা একসময় মাতৃভাষা বিসর্জন দিয়ে অসমীয়া ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন। তবুও তাদের বহিরাগত তকমা থেকে মুক্তি মেলেনি এবং ঘরবাড়ি উচ্ছেদের শিকার হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে একদিকে অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদ বাঙালি পরিচয়ের ওপর এবং অন্যদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদ মুসলিম পরিচয়ের ওপর যুগপৎ আক্রমণ চালাচ্ছে।
এই দীর্ঘ জনসংগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকা স্মরণ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি উল্লেখ করেন, এক শতাব্দী আগে আসামের চরাঞ্চলের নিপীড়িত মানুষের নাগরিক অস্তিত্ব রক্ষায় লাইন প্রথা ও বাঙাল খেদাও রাজনীতির বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মওলানা ভাসানী। ১৯২৪ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাসান চরে বিশাল কৃষক সমাবেশের পর তিনি ভাসানী নামে পরিচিতি পান। আটবার কারাবরণ এবং আসাম থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে এই অঞ্চলে মানুষের নাগরিক অধিকার কোনো আকস্মিক বিষয় নয়।
বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি কেবল দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্তিত্বের ওপর চাপ তৈরি করছে বলে সতর্ক করেন নাহিদ ইসলাম। সীমান্ত দিয়ে রাষ্ট্রহীন করে ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা দুই দেশের মধ্যবর্তী অরক্ষিত সীমারেখায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে তিনি সরকারের ভূমিকা নিয়ে সুস্পষ্ট প্রশ্ন তোলেন। বিজিবির সীমান্ত পাহারা বা ভারতকে নিয়মিত চিঠি পাঠানোর পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে এই উচ্ছেদ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নগাঁওয়ের উচ্ছেদ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট আন্তর্জাতিক বা জাতীয় কূটনৈতিক অবস্থান দৃশ্যমান না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানতে চান, দেশের ঘোষিত জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার নীতি কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না।
সীমান্তে পুশইন তৎপরতা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছে একটি বিস্তারিত শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান এনসিপির এই আহ্বায়ক। পাশাপাশি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চে রাষ্ট্রহীনতার মানবিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে যেকোনো ধরনের জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চেয়েছেন তিনি।
সর্বশেষে তিনি সতর্ক করে দেন যে আসামের সংকটকে পুঁজি করে বাংলাদেশে যেন কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। তিনি মন্তব্য করেন, দেশের ভেতরে যেকোনো সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা আসামের নিপীড়নকারীদের অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করবে। তাই অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি রক্ষা করে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় অবস্থান সুস্পষ্ট রাখার আহ্বান জানান তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন