সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬,

মানিক পশারীর দাফন ও সাঈদীর মামলা নিয়ে মুখ খুললেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

মানিক পশারীর দাফন ও সাঈদীর মামলা নিয়ে মুখ খুললেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা

মানিক পশারী

মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর নিজ গ্রাম পিরোজপুরের চিতলিয়ায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে উঠে এসেছে নানা মিশ্র ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ষষ্ঠ সাক্ষী এবং স্থানীয় আদালতের মামলার বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী।

মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়িতে এখন বিরাজ করছে এক থমথমে ও জনশূন্য পরিবেশ।

রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িটি প্রায় জনমানবহীন অবস্থায় রয়েছে। সেখানে প্রতিবেশীদের কারও মুখে শোনা গেছে সাঈদীর ভূয়সী প্রশংসা, কেউ তুলে ধরেছেন মানিক পশারীর সাথে তাদের তিক্ত অতীত অভিজ্ঞতার কথা, আবার অনেকে স্পর্শকাতর এই বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতেই রাজি হননি।

মরহুমের ছোট বোন হেনা পশারী সাঈদী সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, সাঈদী সাহেব একজন আল্লাহর ওলি ছিলেন। তবে তাঁর বড় ভাই কেন সেই সময় সাঈদীর বিরুদ্ধে ওই মামলা ও পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন, তা মানিক পশারী নিজেই ভালো জানেন। তিনি আরও জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁরা কখনো এই বিষয়ে ভাইকে কোনো প্রশ্ন করেননি।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হেনা পশারী জানান, শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে ভাইয়ের অসুস্থতার খবর পান এবং সকাল ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন। মরদেহ পিরোজপুরে আনার পর পরিবারের সদস্যরা পারিবারিক কবরস্থানে কবর খনন শুরু করেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর তাঁরা দেখতে পান যে খোঁড়া কবরটি কে বা কারা মাটি ফেলে ভরাট করে রেখেছে।

হেনা পশারী বলেন, পরিস্থিতি দেখে রাত ১২টার দিকে দুই বোন মিলে নিজেরাই পুনরায় মাটি কেটে কবর তৈরি করেন। পরবর্তীতে রাত দুইটার দিকে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী, মেয়ে এবং পুলিশের একটি দল মরদেহ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছায়। এরপর স্বজন ও পুলিশের উপস্থিতিতে সেখানে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করা হয়। তবে গভীর রাতে এই দাফন প্রক্রিয়ার সময় আশপাশের কোনো গ্রামবাসী বা প্রতিবেশী উপস্থিত ছিলেন না।

চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক খান জানান, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে মানিক পশারী এলাকায় নিজের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন না। তিনি দাবি করেন, মানিক পশারী এলাকায় প্রভাবশালী ছিলেন। রাতের আঁধারে দাফনের সময় গ্রামবাসীরা সেখানে ছিলেন না এবং সকালে উঠে তাঁরা দাফন সম্পন্ন হওয়ার খবর জানতে পারেন। সাঈদীর প্রসঙ্গ টেনে আব্দুল মালেক দাবি করেন, মুরব্বিদের মুখে তিনি শুনেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাটি সঠিক ছিল না।

আরেক প্রতিবেশী সাফিয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, মানিক পশারীর বাড়ির পাশে জমি কিনে ঘর নির্মাণের সময় তাঁরা তাঁর পক্ষ থেকে নানা ভয়ভীতি ও বাধার মুখে পড়েছিলেন, যার ফলে পরবর্তীতে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। সাফিয়া বেগম জানান, গ্রামে তাঁর কোনো জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে টুঙ্গিপাড়ায় জানাজা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। রাতে মরদেহ গ্রামে এনে স্ত্রী, কন্যা ও বোনেরা মিলেই দাফনের কাজ শেষ করেছেন এবং সেখানে গ্রামবাসীর উপস্থিতি ছিল না।

প্রতিবেশী হাসিনা বেগম জানান, পিরোজপুর শহর থেকে মরদেহ গ্রামে আনার পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তবে রাতে ভয়ের কারণে তাঁরা ঘর থেকে বাইরে বের হননি। সাঈদী প্রসঙ্গে হাসিনা বেগম বলেন, সাঈদী একজন সম্মানিত মাওলানা ছিলেন এবং ওয়াজ মাহফিলে তাঁর মুখ থেকে কেবল ধর্মীয় ভালো ভালো কথাই শুনেছেন। তিনি কোনো অপরাধে যুক্ত ছিলেন কি না তা তাঁর জানা নেই। তাঁর মতে, মানিক পশারী মিথ্যা মামলা দিয়ে সাঈদীকে হয়রানি করেছিলেন এবং এর বিচার আল্লাহ করবেন।

গত শনিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থানকালে মানিক পশারী মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় দুই মাস ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শনিবার দুপুরে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হলে স্থানীয়দের একাংশের আপত্তির মুখে কিছুটা জটিলতার সৃষ্টি হয়। এরপর পুলিশ সদস্যরা মরদেহটি দ্রুত পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যান। সেখানে বিকেল পাঁচটার দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা জানানো হয় এবং পরে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় মরদেহ রাখা হয়।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, টুঙ্গিপাড়ায় মরহুমের একটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী জানিয়েছেন, সেখানে কোনো জানাজা হয়েছে কি না তা তাঁর জানা নেই এবং এই সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা কার্যক্রম তাঁদের থানায় নথিবদ্ধ হয়নি।

এদিকে দাফনে বাধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি দাবি করেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফন করতে জামায়াত বা তাদের কোনো অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা বাধা দেননি। বরং পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করে দাফনকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন যে জামায়াতে ইসলামী মরদেহের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেন যে পুলিশের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। তিনি জানান, সেখানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং সার্বিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে পিরোজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রথম আনুষ্ঠানিক নালিশি মামলা দায়ের করেছিলেন মানিক পশারী। পরবর্তীকালে সেই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে গৃহীত হয় এবং সেখানে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন।