অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১১:৩৬ এএম
কবর দিতে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধীদলে থাকতেই যদি সাধারণ মানুষের বসতভিটায় দাফনে বাধা দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রের পূর্ণ ক্ষমতা হাতে পেলে দলটি কেমন আচরণ করবে। পিরোজপুরের একটি দাফন বিতর্ক নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিস্তারিত স্ট্যাটাসে এই প্রতিক্রিয়া জানান ডা. তাসনিম জারা। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে কারও মৃত্যু হলে কবর খনন বা দাফনের জন্য কাউকে অনুরোধ করতে হয় না; প্রতিবেশী যুবকেরা নিজেরাই কোদাল, বাঁশ ও চাটাই নিয়ে এগিয়ে আসে এবং দ্রুত দাফন সম্পন্ন করাই আমাদের সামাজিক রেওয়াজ।
পোস্টে তিনি জানান, গত শনিবার সকাল দশটার দিকে পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর দিনভর তাঁর পরিবারকে মরদেহ নিয়ে চরম মানসিক উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করেন এবং মাইকিং ও ফেসবুকে ঘোষণা দেন যে পিরোজপুরের মাটিতে তাঁকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।
নিহতের পরিবারের বরাতে তাসনিম জারা লেখেন, মরদেহের জন্য নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে প্রথমে একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু মানিক পশারীর মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কিছু ব্যক্তি এসে সেই খোঁড়া কবরটি জোরপূর্বক মাটি ফেলে ভরাট করে দেয়। পরবর্তীকালে প্রতিকূল পরিস্থিতির আশঙ্কায় আশপাশের কাউকে না পেয়ে মেয়ে সীমু আক্তার তাঁর ফুফুদের সঙ্গে নিয়ে নিজেরাই নতুন একটি কবর খনন করতে বাধ্য হন।
যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।
তিনি লেখেন, শেষ পর্যন্ত গভীর রাতের পর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে মেয়ে ও বোনেদের খোঁড়া সেই কবরেই মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়া পরিবারের বাইরের কোনো সাধারণ মানুষ বা গ্রামবাসী সেই দাফনে অংশ নিতে পারেননি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে তাসনিম জারা উল্লেখ করেন, পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সে সময় দাবি করেন যে মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দলীয় ওই নেতা ঘোষণা দেন যে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও হতে দেওয়া হবে না। অথচ দাফন শেষ হওয়ার পর সেই একই নেতা আবার দাবি করেন যে জামায়াত লাশের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।
তাসনিম জারা তাঁর ফেসবুক বার্তায় স্পষ্ট করেন, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন তোলার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার যে কারও থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় যাচাই-বাছাইয়ের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের নেতা-কর্মীরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে মাইক হাতে নিয়ে এবং মরদেহ দাফনে বাধা সৃষ্টি করে সেই প্রশ্নের মীমাংসা করতে মাঠে নেমেছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জানাজার পূর্বে মৃতের পরিবার সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় এবং মানুষও মৃত্যুর সঙ্গে সব হিসাব চুকিয়ে দিয়ে ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু শনিবার পিরোজপুরে মানিক পশারীর পরিবারকে সেই সাধারণ সামাজিক ও ধর্মীয় সুযোগটুকুও দেওয়া হয়নি। এমনকি নিজের গ্রামে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠানের সুযোগ থেকেও পরিবারটিকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
জামায়াত নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, `পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না` এমন কথা বলা হচ্ছে যেন এই মাটির মালিকানা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নামে লেখা। একাত্তরে দলগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা জামায়াত আজ ক্ষমতার দাপটে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি অতীতের রাজনৈতিক স্লোগানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, বিরোধীদলে থাকা অবস্থায়ই যদি এমন অসহিষ্ণু আচরণ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে নাগরিক অধিকার ও ইনসাফের ভবিষ্যৎ কী হবে তা ভাবার বিষয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন