অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১১:২৪ এএম
বকেয়া বেতনের দাবিতে গাজীপুরের টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বেতন বকেয়া রেখেই কারখানার ফটকে ঝুলল বন্ধের নোটিশ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল থেকে লাকি স্টার নামের ওই কারখানার শ্রমিকেরা কর্মস্থলে এসে কাজে যোগ না দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা কারখানার সামনের আঞ্চলিক সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা আগাম নোটিশ প্রদান ছাড়াই বকেয়া বেতন পরিশোধ না করে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।
বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৩ অক্টোবর তাঁদের বেতন পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ ছিল। কিন্তু সেই সময়ে পাওনা টাকা না দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। সোমবার সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে যোগ দিতে এসে কারখানার প্রধান ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ ঝুলতে দেখেন তাঁরা। কারখানা বন্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে আগে থেকে তাঁদের কোনো বার্তাই দেওয়া হয়নি বলে শ্রমিকেরা দাবি করেন।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে কারখানার অপারেটর জুয়েল হোসেন জানান, ১৩ তারিখে বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তী দিনগুলোতে কেবল সময় বাড়ানো হয়েছে। সকালে কারখানায় এসে তাঁরা দেখেন প্রধান ফটকে কারখানা বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের বেতন পরিশোধ না করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আরেকজন অপারেটর মনোয়ার হোসেন ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, বেতন না পেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে দিনাতিপাত করবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। বাড়িভাড়া পরিশোধ ও মুদি দোকানের আগের বাকি মেটানো এখন তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতি মাসেই বেতন আদায়ের জন্য এভাবে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয় এবং মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেও সময়মতো ন্যায্য পারিশ্রমিক মিলছে না।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার হুঁশিয়ারি দিয়ে অপারেটর রোজিনা জানান, বকেয়া সমুদয় বেতন পুরোপুরি পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁরা এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন। নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ থেকে ফিরে যাবেন না বলেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
শ্রমিকদের প্রধান অভিযোগ, বকেয়া বেতন না দিয়ে এবং আগাম তথ্য না জানিয়ে আকস্মিকভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত শ্রমিক চরম আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। শ্রম আইন মেনে চলা এবং সময়মতো শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে কারখানা কর্তৃপক্ষের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল বলে তাঁরা মনে করছেন। আইন অনুযায়ী ন্যূনতম ন্যায্য সুবিধা থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।
শ্রমিকেরা উল্লেখ করেন, এই মজুরিই তাঁদের পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই আয়ের ওপর ভিত্তি করেই বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিল, সন্তানদের বিদ্যালয়ের খরচ এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়। আকস্মিকভাবে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো পরিবার নিয়ে তাঁরা গভীর দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। অবিলম্বে কারখানা পুনরায় চালু এবং সমস্ত বকেয়া পরিশোধের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংকটের বিষয়ে লাকি স্টার কারখানার মহাব্যবস্থাপক শামসুদ্দিন জানান, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রস্তুতকৃত পণ্য সময়মতো জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং ব্যাংক থেকেও কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। এই তীব্র আর্থিক সংকটের কারণেই তাঁদের মালিকানাধীন তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে টঙ্গী এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে শিল্প পুলিশ। শিল্প পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর হক জানান, আন্দোলনরত শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকপক্ষের সাথে একযোগে আলোচনা চালানো হচ্ছে। উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে উদ্ভূত সংকট দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন