অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জন ও রাজনৈতিক আলোচনা সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত নাশকতা ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, জনমনে ভীতি সঞ্চার এবং মাঠ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একযোগে গুলি ছোড়া, ককটেল বিস্ফোরণ, আকস্মিক ঝটিকা মিছিল এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ এ বিষয়ে জানান, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে ঘিরে সুপরিকল্পিতভাবে সমাজে আতঙ্ক ছড়াতে চাইছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস বিনষ্ট করা। তবে এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্ট করেন, বাহিনী নিরপেক্ষভাবে সব ধরনের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাকে আইনের আওতায় আনছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সামনের দিনগুলোতে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
গত ২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অটোরিকশায় মাইক বেঁধে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আনুষ্ঠানিক বার্তা প্রচারের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এ সংক্রান্ত তৎপরতা নতুন মাত্রা পায়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পরিস্থিতি নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল অভিযোগ করে বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে আঁতাত করে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তবে দেশের সাধারণ মানুষ সতর্ক রয়েছে এবং অতীতের অপকর্মের বিচার প্রচলিত আইনেই নিশ্চিত করা হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, চলমান ঘটনাগুলো ডিসেম্বর ঘিরে ক্ষমতাচ্যুতদের পরিকল্পিত চক্রান্ত, নাকি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোনো গাফিলতির সুযোগে ঘটছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আতঙ্কের এই রেশ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও আঘাত হেনেছে।
শনিবার ভোরে রাজধানীর মগবাজার এলাকার বিশাল সেন্টারের সামনে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হয়। চালকের পেছনের আসনের কাচ ভেঙে গেলেও ওই সময় গাড়িতে কেউ না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে এবং সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে অটোরিকশা থেকে নেমে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান ও ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, হামলার নেপথ্যের কারণ উদঘাটনে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তদন্ত চলছে।
এর আগে পুরান ঢাকার হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের গুদামে মুখোশধারী ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারা ল্যাপটপ, রাউটার ও নেটওয়ার্ক ভিডিও রেকর্ডারসহ প্রায় ৩১ লাখ টাকার সম্পদ লুট করে।
পরবর্তীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নাম ভাঙিয়ে মাসিক চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং মামলা তুলে না নিলে বাদীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জানান, এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হুমকিদাতার কল রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তে দেখা গেছে, হুমকি দিতে ব্যবহৃত মোবাইল সংযোগটি হবিগঞ্জের এক নারী চা-শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি করে সংগ্রহ করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম জানান, তাদের ৩৫০টি পরিবহন ও ৮০০ কর্মীর মধ্যে গভীর শঙ্কা কাজ করছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টির গভীর চক্রান্ত চলছে।
পলাতক নেতাকর্মীরা ডার্ক ওয়েব থেকে অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশি ভার্চুয়াল নম্বর সংগ্রহ করে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করছে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো গোপনীয় এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং সম্পাদকদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলমকে ফোন করে হুমকি দেওয়ার একটি অডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক কামারুম মুনিরা জানিয়েছেন, পুলিশ ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে হুমকিদাতাদের শনাক্ত করার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা ব্যক্তিদের আইনি সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
একই সঙ্গে খুলনা অঞ্চলেও সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। তেরখাদায় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ছাড়াও লবণচরা ও সংলগ্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে খুশি বেগম ও তুষার নামের দুজন নিহত হন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, পেশাদার অপরাধীদের ধরতে দেশজুড়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং বাহিনীকে আরও কার্যকর করতে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার যেকোনো চক্রান্ত কঠোর হাতে দমন করতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, কঠোর পদক্ষেপ নিলে অনেক সময় একপাক্ষিক সমালোচনা আসে, আবার কিছুটা নমনীয় হলে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এই দ্বিমুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও ডিএমপি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন