মার্চ ৭, ২০২৬, ১১:২৬ এএম
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজে নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সম্প্রতি গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে উড়োজাহাজটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়েছে।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ওই বিশেষ ফ্লাইটে প্রকৌশল ও নিরাপত্তা বিভাগের চরম অব্যবস্থাপনার তথ্য নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কমিটি। বিমানের উপপ্রধান প্রকৌশলী মো. মনসুরুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বারবার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যসচিব ছিলেন ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক মো. জুবিয়ারুল ইসলাম।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে গত বছরের ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর উড়োজাহাজটিতে একাধিক কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়লেও তা যথাযথ গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়নি।
নথিপত্র অনুযায়ী ১০ ডিসেম্বরের নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা হয়েছিল যা এই মডেলের অত্যাধুনিক উড়োজাহাজের জন্য অস্বাভাবিকভাবে কম সময়। এছাড়া ত্রুটি নির্ণয় এবং এর কার্যকারিতা পরীক্ষার কোনো বিস্তারিত রেকর্ড বা লগ সংশ্লিষ্ট বিভাগ উপস্থাপন করতে পারেনি। ১৫ দিনের ব্যবধানে একই ধরণের ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে বারবার ফ্লাইটের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিমানের সিস্টেম সাধারণত সর্বশেষ ২৭টি ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষণ করলেও তদন্ত শুরুর সময় প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য পাওয়া যায়নি যা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গায়েব করার ইঙ্গিত মিলেছে।প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইটটি যখন মাঝ আকাশে ছিল তখন পুনরায় এর ভিএফএসজি বিকল হয়ে যায়। এর ফলে ইঞ্জিনের গিয়ারবক্সে বড় ধরণের ক্ষতি কিংবা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের প্রবল আশঙ্কা ছিল। প্রকৌশল বিভাগের এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ উড়োজাহাজ ভিভিআইপি ফ্লাইটে অন্তর্ভুক্ত করায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
এটি কেবল কারিগরি ব্যর্থতা নয় বরং পুরো ব্যবস্থার একটি সুসংগঠিত সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে তদন্ত কমিটি। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উড়োজাহাজটিকে ফ্লাইটে পাঠানোকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এর ফলে বিমানের প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করা, অন্য উড়োজাহাজ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে এনে লাগানো এবং অতিরিক্ত জনবল ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে এই বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুজন প্রকৌশলী হীরালাল এবং মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে লো ফুয়েল প্রেসারের সতর্কতা পাওয়ার পরেও তারা প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করেই উড়োজাহাজটিকে পুনরায় পরিষেবায় ফেরত দেওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দায় নির্ধারণ ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। বিষয়টি বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে জমা পড়লেও কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন