রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

দেশে মজুত জ্বালানি তেল কতদিন চলবে?

জাতীয় ডেস্ক

মার্চ ২৪, ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

দেশে মজুত জ্বালানি তেল কতদিন চলবে?

তেল মজুতের বর্তমান চিত্র

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনার প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী তেলের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। 

এমন পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও পূর্ণ নিশ্চয়তা না মেলায় আগামী মাসগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক ভোক্তা সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। 

এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বাড়তি ভিড় ও দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সোমবার পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ডিজেলের মজুত ছিল প্রায় দুই সপ্তাহের সমপরিমাণ। 

বর্তমানে ডিজেলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় সোয়া ছয় লাখ টন হলেও বর্তমানে সরবরাহযোগ্য মজুত রয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন যা মোট সক্ষমতার ২৯ শতাংশ। কৃষি সেচ এবং পণ্য পরিবহনে ডিজেলের ওপর দেশ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় এই মজুত পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় অকটেনের মজুত দিয়ে মাত্র ৯ দিন এবং পেট্রলের মজুত দিয়ে প্রায় ১১ দিন স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব। বর্তমানে দেশে ১১ হাজার টন অকটেন এবং ১৬ হাজার ৬০৫ টন পেট্রল মজুত রয়েছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে বড় কোনো সংকট বলতে নারাজ সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন যে দেশে এখনো তেলের কোনো বাস্তব ঘাটতি তৈরি হয়নি। ইতোমধ্যে কয়েকটি তেলের জাহাজ বন্দরে এসে পৌঁছেছে এবং আরও কয়েকটি আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এপ্রিল মাসের আমদানি পরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকেও পরিশোধিত ডিজেল কেনার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

প্রতিমন্ত্রীর মতে সাধারণ মানুষের মাঝে কাজ করা সাময়িক আতঙ্ক ও অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতাই মূলত তেলের পাম্পগুলোতে ভিড় ও সরবরাহে সাময়িক চাপ তৈরি করছে। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে অন্যান্য জ্বালানির মজুত তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। ফার্নেস তেলের মজুত দিয়ে প্রায় ২৯ দিন এবং বিমানে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের মজুত দিয়ে ২৩ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। 

কেরোসিনের মজুত রয়েছে ৪৬ দিনের এবং মেরিন ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৪৪ দিনের সরবরাহ সচল রাখার মতো। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে যা দিয়ে আরও ১৮ দিনের মতো তেল পরিশোধন ও উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া যাবে। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে এই উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে জাহাজ চলাচলের সূচি পরিবর্তন এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া আমদানির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় যার একটি বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইন বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে আতঙ্কে চাহিদা বেড়ে যাওয়া এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত বিকল্প আমদানিকারকদের সাথে চুক্তি এবং অভ্যন্তরীণ মজুত ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর তদারকির পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখতে সব ধরণের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।