এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১০:০৮ এএম
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, ঠিক তখনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে ঢাকা সফরে এসেছেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং গত দেড় দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী করণীয় কী, তা নিয়ে তিনি তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এই মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ বর্তমানে জাতিসংঘের ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ’ বিষয়ক সপ্তম স্পেশাল র্যাপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।ঢাকা সফরের অভিজ্ঞতায় ড. অ্যালিস জানান যে, তিনি বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে উপস্থিত হয়েছেন।
এখানে সাধারণ মানুষের যেমন উচ্চ প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গভীর আগ্রহ কাজ করছে। তিনি মনে করেন বাংলাদেশে সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে এবং এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। সরকারের পক্ষ থেকে ‘সংসদীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠনের চিন্তাকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, মানবাধিকারকে কখনো রাজনীতির চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। এটি একটি সর্বজনীন অধিকার এবং সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে এটি পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন যাতে মানবাধিকার নিয়ে রাজনীতিকরণের সংস্কৃতি বন্ধ হয়।
পুলিশি সংস্কার ও জিজ্ঞাসাবাদের আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে ড. অ্যালিস বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সঠিকভাবে তথ্য দিতে পারেন না, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে আন্তর্জাতিক ‘মেন্ডেস প্রিন্সিপালস’ অনুসরণের পরামর্শ দেন। ড. অ্যালিসের মতে, বাংলাদেশ পুলিশে একটি আমূল সংস্কার আসা জরুরি, যা কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক জঞ্জাল পরিষ্কার করার প্রক্রিয়া হবে।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং করার ওপর তিনি জোর দেন, যা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। পুলিশকে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।বিতর্কিত বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব নিয়ে ড. অ্যালিসের অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি মনে করেন, কোনো বাহিনীর পরিবর্তন যেন শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘রিব্র্যান্ডিং’ না হয়।
শুধু নাম বদলে দিলে বাহিনীর চরিত্র বদলায় না, বরং তাদের কাজের পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এবং সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তিনি স্পষ্টভাবে জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় সংঘটিত নৃশংসতার বিচার প্রক্রিয়া এমনভাবে হতে হবে যেখানে ভুক্তভোগীরা নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারেন। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা ছাড়া জনগণের আস্থা ফিরে আসা কঠিন বলে তিনি মনে করেন।নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে ড. অ্যালিস বলেন, বাংলাদেশ অনেক আগেই এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার এই অনুচ্ছেদের ওপর থেকে আগের সব আপত্তি তুলে নেওয়ায় একটি ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট তহবিলের মাধ্যমে নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। কেবল সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান নয়, গত অনেক বছর ধরে যারা পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের সবার বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। মানবাধিকার কোনো বিলাসিতা নয় বরং এটি একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান স্তম্ভ বলে তিনি মন্তব্য করেন।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন