সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম
ইন্টারনেট বন্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী সাবাব হোসেন মেহের। রোববার ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে ও সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানান। এই মামলায় তিনি নবম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া ২৩ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
জবানবন্দিতে তিনি জানান, আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ, র্যাব ও ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা অতর্কিত হামলা চালায়। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগানের গুলি ছোড়া হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসের ফটকের ভেতরে আশ্রয় নিলে সেখানেও পুলিশ সরাসরি গুলি চালায়।
এতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ থেকে ২৫০ জন এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ওই দিন পুলিশের গুলিতে ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী জিল্লুর শেখ নিহত হন এবং দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার মরদেহ ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আসা হয়। ঘটনার দিন রাতে বাসায় ফিরে তিনি দেখতে পান ব্রডব্যান্ড ওয়াইফাই সংযোগ কাজ করছে না। মুঠোফোনের তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক সচল করার চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন।
পরে পরিচিতদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে নিশ্চিত হন যে দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করা, মোবাইল সংযোগে বাধ্য করে নজরদারি চালানো এবং ব্লক রেইডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আটকের পথ সুগম করতেই ওই সংযোগ বন্ধ করা হয়েছিল। একই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলা প্রাণহানির ঘটনা যেন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্যই এই কৌশল নেওয়া হয়। বন্ধুদের মাধ্যমে তিনি রামপুরা ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপক গুলি চালানোর খবর পান।
পরের দিন ১৯ জুলাই আফতাবনগর আবাসিক এলাকার মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যান তিনি। মসজিদটি ছিল ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই। নামাজ শেষে ওই এলাকার একটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে তিনি দেখতে পান রামপুরা ব্রিজের দিক থেকে আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর সমন্বিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তার চোখের সামনেই ৪ থেকে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে নির্বিচার গুলিবর্ষণ করতে থাকে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই দিন রামপুরা ও সংলগ্ন এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০ জন নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন।
জবানবন্দির শেষভাগে তিনি জানান, ১৮ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সীমিত আকারে চালু হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি অডিও কথোপকথনের বরাতে তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মধ্যকার ওই আলোচনায় প্রকাশ পায় যে শেখ হাসিনার নির্দেশে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছিল। এই সার্বিক দমনপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন