জুন ২৬, ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। চীনের অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারষ্পরিক সম্পর্ক দ্বিপাক্ষিক গণ্ডি পেরিয়ে এক অনন্য বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।আজ শুক্রবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর দুইটায় এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।
সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এই বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই স্বল্প সময়ের সফরে প্রধানমন্ত্রী চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর তিন রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব—প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে আলাদাভাবে অত্যন্ত সফল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে যে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক গভীর আস্থা, রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।
উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্মতির ভিত্তিতে শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি মিনিস্ট্রি-টু-মিনিস্ট্রি বা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চীনের বিভিন্ন অংশীজনদের এবং ১টি দুই দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।
এ ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের সামগ্রিক সফলতার ওপর ভিত্তি করে একটি ১৬ দফার যৌথ ইশতেহার প্রণয়ন করা হচ্ছে। চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘ ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনবদ্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী আবারও ‘ওয়ান চায়না পলিসি’ বা এক চীন নীতির প্রতি দেশের সুসংহত ও দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বর্তমান সরকারের জন-কেন্দ্রিক নীতিগুলোকে চীন গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে বাংলাদেশের উৎপাদন ও পোশাক খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে তৈরির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সাথে চীন থেকে বাংলাদেশে শিল্প কারখানা স্থানান্তর এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চীন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলে আশ্বস্ত করেছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, সড়ক, সেতু ও আধুনিক রেলওয়ের মতো মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থায় চীন বড় ধরনের সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ইকোনমিক জোন ও মোংলা ইকোনমিক বা জোনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রিন এনার্জি ও পরিবেশবান্ধব টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনার প্ল্যানিং থেকে শুরু করে কারিগরি সব স্তরে চীন সরকার সরাসরি যুক্ত হতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নেও চীন কাজ করবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় চীন সহযোগিতা করবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চীন স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় চীন কার্যকর মধ্যস্থতা করবে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘টু প্লাস টু’ ডায়ালগ মেকানিজম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশ আবেদন করলে চীন তাকে স্বাগত জানাবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন