জুলাই ৩০, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আন্দোলন চলাকালে হাসপাতালগুলোতে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের আটকে রাখতে এবং কোনো চিকিৎসা না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
হাসপাতালের বেডে কাতরানো শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের এমন অমানবিক আচরণ কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।পঙ্গু হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসকদের প্রতি এই কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্র নিশ্চিত করেছে। আহত রোগী, তাদের স্বজন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে।
ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের পাশাপাশি শহীদদের লাশ নিয়েও নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল সে সময়। ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফন এবং ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে গুলির কথা লিখতে না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।চব্বিশের ত্রিশে জুলাই দিনটি ছিল ঐতিহাসিক প্রতিরোধের এক মাইলফলক। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হলেও মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।
শিক্ষার্থীরা গলা ও মাথায় লাল কাপড় বেঁধে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল লাল রঙে রাঙিয়ে প্রতিবাদমুখর পরিবেশ তৈরি করেন। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল বের করেন। রাজপথে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাদের আট দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জোরালো অবস্থান জানান দেয়।অভ্যুত্থানের ওই দিনগুলোতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সিসি ক্যামেরা দেখে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের ব্যাপক অভিযান চালানো হয়।
শুধু রাজধানী ঢাকাতেই দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজনদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল।আন্তর্জাতিক মহলেও তৎকালীন সরকারের এই দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। নানা দমনপীড়ন ও কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও জুলাই বিপ্লবের গণজোয়ার থামানো সম্ভব হয়নি।ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন মহলে নানামুখী তৎপরতা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই ক্ষমতার পতন ঘটে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন