শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
জাতিসংঘে ইতিহাস সৃষ্টি

জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস গড়বেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস গড়বেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ৩টায় (নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা) মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় এবার বিশ্বদরবারে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও অনুভূতি তুলে ধরে নতুন ইতিহাস রচনা করতে যাচ্ছেন সরকারপ্রধান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলের লবিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।

সফরের দ্বিতীয় দিনের কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে তিনি জানান, দিনের শুরুতেই বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সাথে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনায় মূলত স্বাস্থ্য ও কৃষি—এই দুটি মৌলিক খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং ‍‍`স্মার্ট ফার্মার কার্ড‍‍` চালুর বিষয়ে বৈঠকে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং সরকারের এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এই নিয়োগে স্বাস্থ্যকর্মীদের শতকরা ৮০ ভাগই হবেন নারী। গেটস ফাউন্ডেশন এই দুটি খাতেই আর্থিক ও কারিগরি অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুতই তাদের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসবে।

জাতিসংঘের সদরদপ্তরে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ‍‍`জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি‍‍` শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের সাইডলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বহুপাক্ষিক বৈঠকে গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত সরাসরি অংশ নেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ ওআইসি এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিশ্বনেতাদের সামনে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি অতীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সফল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সেই বাস্তবতার আলোকেই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, সেখানে আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সংকট দূর করার জোর দাবি তোলেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের উদার মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং ইরানের প্রেসিডেন্টের সাথে দুটি পৃথক ও তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, সরাসরি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। জাতিসংঘে আয়োজিত ‍‍`ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড জাস্ট ট্রানজিশন‍‍` শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের ফোরামে পরিবেশ সুরক্ষায় নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন, এবং সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের কাছে তুলে ধরেন। কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। বাণিজ্যিক কূটনীতির অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডু, বাণিজ্য বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি উইলিয়াম কিমিট, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং বাণিজ্যিক বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি বিনয় চাওলা উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি শেষে বোয়িংয়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা, এবং প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, মোস্তফা জুলফিকার হাসান, মো. সুজাউদ্দৌলা ও শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন উপস্থিত ছিলেন।