অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১২:২২ পিএম
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলাগুলোতে সাক্ষ্য দিতে দীর্ঘদিন হাজির না হওয়ায় বর্তমানে কর্মরত ও বিভিন্ন স্থানে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আদালত এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক প্রশাসনিক চিঠি থেকে এই তথ্য জানা গেছে। বারবার সমন ও জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও এই পুলিশ সদস্যরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় বহু বছর ধরে বিচারাধীন থাকা মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
এই সংকট নিরসনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সদর দপ্তর থেকে গত ৩ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে মোট ১৮টি পৃথক স্মারকে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত বিচারিক তারিখে সকাল নয়টায় সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব সাক্ষীর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একাধিকবার সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সর্বশেষ পর্যায়ে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তারা সাক্ষ্য দিতে আসেননি। দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যদের এমন ধারাবাহিক অনুপস্থিতি ফৌজদারি মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
সাক্ষীদের এই তালিকায় সাধারণ কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত আছেন। বাকি সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষ শাখা এসবি-র মতো বিশেষায়িত বিভিন্ন ইউনিটেও অনেকে নিয়োজিত রয়েছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী এবং ইপিজেড থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে তারা সাক্ষী ছিলেন। এসব মামলার বিচার চলছে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত ও শিশু আদালতে।
সাক্ষীর অভাবে এমনকি ২০২২ সালের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচারকাজও পুরোপুরি আটকে গেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত একটি হত্যা মামলায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার লিখিত নির্দেশ দেন। আদালতের ওই আদেশে বলা হয়, ২০২২ সালে দায়ের হওয়া ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর বাদীসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে বারবার আদেশ জারি করা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ তাদের উপস্থিত করতে পারেনি। এর ফলে গুরুতর এই হত্যা মামলার বিচার এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আগামী ১৮ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ কমিশনার বরাবর আদালতের আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। আদেশে আরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়, নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭১(২) ধারার আলোকে যদি কোনো নেতিবাচক বিচারিক ফল তৈরি হয়, তবে তার সম্পূর্ণ দায় পুলিশ প্রশাসনের ওপরই বর্তাবে। আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বা ঘটনাস্থলে থাকা সদস্যরা অন্য জেলায় বদলি হয়ে যাওয়ায় এই জটিলতা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আদালত থেকে পাঠানো সমন প্রথমে যায় সদস্যের পুরোনো কর্মস্থলে। সেখান থেকে জেলা রিজার্ভ অফিস ও মেট্রোপলিটন দপ্তর ঘুরে নতুন কর্মস্থলে পৌঁছাতে কয়েক মাস লেগে যায়। অনেক সময় সমন পৌঁছালেও সংশ্লিষ্ট থানা বা ইউনিট থেকে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ছাড়পত্র পান না সদস্যরা। চট্টগ্রাম আদালতের কয়েকজন বেঞ্চ সহকারী জানান, সমন ও পরোয়ানা জারির মূল লক্ষ্য থাকে আদালতে সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। পরে তারা হাজির হলে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। তবে বছরের পর বছর সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়।
একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে নোয়াখালী জেলাতেও। নোয়াখালীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে জেলার বিভিন্ন থানা ও বিশেষায়িত ইউনিটে পাঠানো আদেশে ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে অবিলম্বে আদালতে হাজির করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ধার্য দিনে সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব ঘটছে। নির্ধারিত তারিখে হাজির না থাকা এবং দায়িত্বশীলভাবে সাক্ষ্য প্রদান না করা সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্য নিশ্চিত করতে এর আগেও একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতের মামলাগুলোতে সাক্ষ্য দিতে সিএমপি, জেলা পুলিশ ও ডিএমপিতে কর্মরত ৩৩ জন সদস্যকে চিঠি দেওয়া হয়। এর আগে গত বছরের ১৯ নভেম্বরও একই ধরনের তলবি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। গত কয়েক মাসের মধ্যে অন্তত ১০টি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে তিন শতাধিক পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য তাগাদা দিয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার গণমাধ্যম আমিনুর রশিদ জানান, এরা কেউ কোনো মামলার আসামি নন, এটি মূলত সাক্ষীকে উপস্থিত করানোর নিয়মিত প্রশাসনিক তাগাদা। তিনি উল্লেখ করেন, এটিকে নিয়মিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং সাক্ষ্যগ্রহণের স্বার্থে বিশেষ তলব। দূরবর্তী জেলায় বদলি হওয়া, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা ঠিক সময়ে সমন হাতে না পৌঁছানোর কারণে অনেকেই উপস্থিত হতে পারেন না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সাক্ষীর মৃত্যুও ঘটেছে। তিনি জানান, মামলাগুলো এগিয়ে নিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সাতশ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি হাজার হাজার সাধারণ পাবলিক সাক্ষীকেও তলব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রাজ্জাক জানান, সমন কার্যকর না হওয়া কিংবা সদস্যদের অবসর গ্রহণের কারণে সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকতে পারেন, যার ফলে মামলার দীর্ঘ জট সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিচারিক বিধান অনুযায়ী একবার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলে তা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত শুনানি চলার কথা। সরকার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তিতে আইন সংশোধন ও নতুন আদালত বসালেও সমন পৌঁছানো, যাতায়াত খরচ ও সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে জট পুরোপুরি কাটবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, আদালতে পুলিশ সাক্ষীদের দীর্ঘ অনুপস্থিতি সমগ্র বিচারপ্রক্রিয়ার জন্যই একটি গুরুতর সংকট। একজন পুলিশ সদস্যের গাফিলতিতে বছরের পর বছর বিচার আটকে থাকলে সাধারণ বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র উভয় পক্ষই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি তাগিদ দেন, বদলি বা প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা থাকলে পুলিশ বিভাগকেই তার সমাধান করতে হবে। পরোয়ানা ও নির্দেশনার পরও হাজির না হলে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন